মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের সাম্প্রতিক ভারত সফরকে কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই সফর আসলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির এক জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বিদ্রোহ, সীমান্ত রাজনীতি এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
ভারত ও মিয়ানমারের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই দ্বৈত বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দুই দেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলে, অন্যদিকে সীমান্তজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক সংঘাত সেই সম্পর্ককে বারবার জটিল করে তোলে। মিন অং হ্লাইংয়ের দিল্লি সফরের পরপরই সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা এই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারতের প্রধান উদ্বেগের একটি হলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি। মিয়ানমারের ভেতরে এসব গোষ্ঠীর আশ্রয় ও কার্যক্রম নিয়ে বহু বছর ধরে উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিজেও এমন এক অবস্থানে আছে যেখানে কিছু ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সহাবস্থান বা সহযোগিতা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ আন্দোলনের চাপে থাকা জান্তা সহজে এমন সম্পর্ক ছিন্ন করার অবস্থায় নেই।
এই প্রেক্ষাপটে মিন অং হ্লাইংয়ের ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড দমন করার আশ্বাসের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জান্তার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে নিজেদের টিকে থাকার হিসাবের সঙ্গে মেলাতে হয়। ফলে দিল্লিকে সন্তুষ্ট করার প্রতিশ্রুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এক জিনিস নয়।
তবে ভারতের উদ্বেগ কেবল সীমান্ত নিরাপত্তা নয়। আরও বড় বিষয় হলো চীনের প্রভাব। গত এক দশকে বেইজিং মিয়ানমারে যে মাত্রায় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে, তা ভারতের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন। অবকাঠামো, জ্বালানি, বাণিজ্য করিডর এবং কৌশলগত সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন মিয়ানমারে গভীর অবস্থান তৈরি করেছে।
দিল্লি জানে যে মিয়ানমারকে পুরোপুরি চীনের প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝে যে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি আরও বেশি চীনের অনুকূলে চলে যাবে। তাই ভারতের বর্তমান নীতি মূলত সম্পৃক্ততা বজায় রাখার নীতি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা সামরিক শাসন নিয়ে আপত্তি থাকলেও নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে দিল্লি জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটছে না।

এখানে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে স্থল যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য মিয়ানমার অপরিহার্য। কালাদান প্রকল্প কিংবা ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কের মতো উদ্যোগগুলো ভারতের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক কৌশলের অংশ। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না, তবু দিল্লি এগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় নেই।
নতুন করে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ উপাদান। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং জ্বালানি রূপান্তরের যুগে এসব খনিজের কৌশলগত মূল্য দ্রুত বেড়েছে। মিয়ানমারের সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো ভারতের কাছে তাই শুধু প্রতিবেশী ভূখণ্ড নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অংশ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে মিয়ানমারের জান্তারও ভারতের কাছে কিছু প্রত্যাশা আছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলগুলো থেকে প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি, মানবিক সহায়তা এবং পণ্য প্রবাহ তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ। এসব কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে সামরিক সরকারের চাপ সৃষ্টির কৌশলকে দুর্বল করে দেয়। ফলে নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু ভারতও জানে যে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের গতিপথ এখনো অনিশ্চিত। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পরিস্থিতি বদলালে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই দিল্লি এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইবে না যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সব মিলিয়ে মিন অং হ্লাইংয়ের সফর ছিল না কোনো বড় কূটনৈতিক সাফল্যের প্রদর্শনী। বরং এটি ছিল পারস্পরিক উদ্বেগ প্রশমনের একটি প্রচেষ্টা। ভারত চায় সীমান্তে স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং চীনা প্রভাবের ভারসাম্য। মিয়ানমারের জান্তা চায় প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের অবস্থানকে আরও দুর্বল হওয়া থেকে রক্ষা করতে।
এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎও সম্ভবত একই বাস্তববাদী কাঠামোর মধ্যেই আবর্তিত হবে। কারণ আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে উভয় পক্ষের কাছে বর্তমানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং টিকে থাকার কৌশল। আর সেই কারণেই মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের প্রকৃত অর্থ খুঁজতে হলে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক শক্তির এই জটিল হিসাব-নিকাশকে বুঝতে হবে।
রাজীব ভট্টাচার্য 


















