‘হিরোস’ ও ‘ন্যাশভিল’ টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া মার্কিন অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেটিয়েরে ৩৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর বাবা স্কিপ প্যানেটিয়েরে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মেয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। হেইডেন ছিলেন অসাধারণ প্রাণশক্তির অধিকারী একজন মানুষ, যিনি তাঁর পরিচিত মানুষ এবং পর্দায় তাঁকে দেখা কোটি দর্শকের জীবনে ভালোবাসা ও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ কঠিন সময়ে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধও জানান তিনি।
মাত্র ১১ মাস বয়সে অভিনয়ে যাত্রা
১৯৮৯ সালে জন্ম নেওয়া হেইডেন খুব অল্প বয়সেই অভিনয়ে পা রাখেন। মাত্র ১১ মাস বয়সে একটি খেলনার বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর পর্দায় অভিষেক হয়। নয় বছর বয়সে ‘এ বাগস লাইফ’ ছবিতে ডট চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।
২০০০ সালে ক্রীড়াভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘রিমেম্বার দ্য টাইটানস’-এ অভিনয় করেন। ২০০৪ সালে ডিজনি চ্যানেলের ‘টাইগার ক্রুজ’-এ প্রথমবারের মতো প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান।
‘হিরোস’ দিয়ে বিশ্বজোড়া খ্যাতি
১৭ বছর বয়সে ‘হিরোস’ ধারাবাহিকে ক্লেয়ার বেনেট চরিত্রে অভিনয় করে হেইডেন আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হন। অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এক কিশোরী চিয়ারলিডারের চরিত্রটি দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধারাবাহিকটির বিখ্যাত স্লোগান ছিল—‘চিয়ারলিডারকে বাঁচাও, পৃথিবীকে বাঁচাও।’
এরপর ‘ন্যাশভিল’ ধারাবাহিকে সমস্যায় জর্জরিত দেশীয় সংগীতশিল্পী জুলিয়েট বার্নস চরিত্রে অভিনয় করে আরও প্রশংসা অর্জন করেন তিনি। এই অভিনয়ের জন্য দুবার গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের মনোনয়নও পান। ধারাবাহিকটির জন্য তাঁর গাওয়া ১১টি গান জনপ্রিয় দেশীয় সংগীতের তালিকায় স্থান পেয়েছিল।

চলচ্চিত্রেও ছিল উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি
২০১১ সালের ‘স্ক্রিম ফোর’ এবং ২০২৩ সালের ‘স্ক্রিম সিক্স’-এ কিরবি রিড চরিত্রে অভিনয় করেন হেইডেন। তাঁর অভিনয়জীবনজুড়ে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—দুই মাধ্যমেই ছিল উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি।
ব্যক্তিজীবনে ইউক্রেনের হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন ভ্লাদিমির ক্লিৎসকোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। ২০১৪ সালে তাঁদের কন্যা কায়া ক্লিৎসকোর জন্ম হয়। ২০১৮ সালে হেইডেন মেয়ের পূর্ণ অভিভাবকত্ব ক্লিৎসকোর হাতে তুলে দেন।
আসক্তি ও মানসিক সংকটের সঙ্গে লড়াই
জীবনের একটি কঠিন সময় দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মদ্যপান ও মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে হেইডেনকে। ২০১৫ সালে ‘ন্যাশভিল’-এর শুটিং চলাকালে তিনি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হন। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রাম পরবর্তীতে ধারাবাহিকটির কিছু কাহিনিতেও প্রভাব ফেলেছিল।
২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, জীবনে অনেক উত্থান-পতন এলেও সেসব অভিজ্ঞতার জন্য তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। বরং কঠিন সময় পেরিয়ে আসাকে তিনি নিজের বড় অর্জন হিসেবে দেখেছিলেন।
চলতি বছর প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী ‘দিস ইজ মি: আ রেকনিং’-এ খ্যাতি, সন্তান জন্মের পরের বিষণ্নতা, আসক্তি এবং পুনরুদ্ধারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন তিনি।
মেয়েকে ঘিরে ছিল গভীর ভালোবাসা
মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও মেয়েকে নিয়ে কথা বলেছিলেন হেইডেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সবসময় মেয়েকে নিজের বাহুর মধ্যে আগলে রাখতে তাঁর ইচ্ছা থাকলেও জীবনের বাস্তবতা সবসময় তা সম্ভব করে না। ভবিষ্যতে মেয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে—এমন আশাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
হেইডেন প্যানেটিয়েরে তাঁর বাবা স্কিপ প্যানেটিয়েরে ও মা লেসলি ভোগেলকে রেখে গেছেন। তাঁর ভাই জ্যানসেন প্যানেটিয়েরে ২০২৩ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় মারা যান।
হলিউডের শিশুশিল্পী থেকে আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে ওঠা হেইডেনের জীবন ছিল সাফল্য, ব্যক্তিগত সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক জটিল যাত্রা। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু সেই যাত্রার আকস্মিক সমাপ্তি ঘটাল।
Sarakhon Report 


















