কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি এখন আর শুধু প্রযুক্তি, ব্যবসা কিংবা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার বিষয় নয়। এর সবচেয়ে গুরুতর দিকগুলোর একটি হলো—এই প্রযুক্তি যদি অপরাধী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রীয় শত্রুদের হাতে পড়ে, তাহলে সাইবার হামলার পাশাপাশি জৈব অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও ভয়াবহভাবে সহজ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাগুলো বলছে, এই ঝুঁকি ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়; প্রস্তুতির সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
আগস্টে ‘ফাইভ আইজ’—যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা সহযোগিতা কাঠামো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অত্যাধুনিক সাইবার হামলার সম্ভাবনা নিয়ে যে সতর্কতা দিয়েছে, তা বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। এই জোট সাধারণত প্রকাশ্যে খুব কম কথা বলে। তাই যখন তারা জানায় যে প্রযুক্তির অগ্রগতি প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে এবং সময়ের হিসাব এখন বছর নয়, মাসে নামছে, তখন বিষয়টি অবহেলা করার সুযোগ নেই।
ইতিমধ্যেই তার বাস্তব প্রমাণ মিলছে। নতুন প্রজন্মের এআই মডেলগুলো সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করতে মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত সক্ষম হচ্ছে। কিছু এআই এজেন্ট পরীক্ষামূলক পরিবেশের সীমা অতিক্রম করে নিজে থেকেই সাইবার হামলা চালানোর মতো আচরণ দেখিয়েছে। অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাঙার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ সাইবার নিরাপত্তার পুরোনো প্রতিরোধব্যবস্থা এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছে, যার গতি ও অভিযোজনক্ষমতা প্রচলিত প্রস্তুতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শক্তিশালী এআই প্রযুক্তির কিছু মডেল এমনভাবে উন্মুক্ত করা হচ্ছে, যাতে ব্যবহারকারীরা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন বা সরিয়ে ফেলতে পারে। এর অর্থ, প্রযুক্তির উন্নত সক্ষমতা কেবল দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অপরাধী নেটওয়ার্ক কিংবা শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোও তা নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবে।
সাইবার হামলার বাইরে আরও ভয়ংকর ঝুঁকি
এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা সম্ভবত আরও গভীরে। প্রযুক্তিটি জ্ঞান ও গবেষণার এমন কিছু বাধা কমিয়ে দিতে পারে, যেগুলো এতদিন জৈব অস্ত্র তৈরির পথে স্বাভাবিক প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করেছে।
জুনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি এআই প্রতিষ্ঠানের নেতাদের এক বিরল যৌথ সতর্কবার্তায় বলা হয়, এআই বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করলেও একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে জৈব অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন অনেক সহজ হয়ে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সতর্কতা এসেছে প্রযুক্তি খাতের সেই ব্যক্তিদের কাছ থেকেই, যারা এআইয়ের সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় প্রবক্তাদের মধ্যে রয়েছেন।
এটি নিছক তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়। গবেষকেরা ইতিমধ্যে এআই ব্যবহার করে প্রকৃতিতে আগে না থাকা নতুন ভাইরাস তৈরির সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। ওই গবেষণায় তৈরি ভাইরাস মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং এর লক্ষ্য ছিল ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করা। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সম্পূর্ণ কার্যকর জিনোম তৈরির সক্ষমতা অর্জিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই প্রযুক্তিকে ক্ষতিকর জীবাণুর ক্ষেত্রে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে?
মানুষের ওপর আক্রমণ করতে সক্ষম সম্পূর্ণ নতুন ভাইরাস তৈরি এখনো অনেক কঠিন ধাপের বিষয়। তুলনামূলকভাবে কাছের ঝুঁকি হতে পারে বিদ্যমান জীবাণুর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা, যাকে ‘গেইন অব ফাংশন’ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু মূল সমস্যাটি একই—প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, অথচ সেই সক্ষমতা কার হাতে যাচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা একই গতিতে এগোচ্ছে না।

এআই থামানো নয়, দরকার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ
এআই বিপ্লব থামিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা এত বড় যে বিশ্ব এই অগ্রযাত্রা থেকে সরে আসবে না। বরং এআই চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও গবেষণায় এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।
সমস্যা হলো, সুফলের এই দৌড়ের সঙ্গে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তাল মেলাতে পারছে না। ব্রিটেনের এআই নিরাপত্তা গবেষণার অভিজ্ঞতাও দেখাচ্ছে, পরীক্ষার সময়েই এআই এজেন্ট বাস্তব মানুষের বিরুদ্ধে হ্যাকিংয়ের মতো কার্যক্রম শুরু করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন সীমিত কাঠামোর মাধ্যমে ঝুঁকি পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোও সহযোগিতার পথ খুঁজছে। অন্যদিকে চীন রাশিয়া, ইরানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলাদা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ছে।
এভাবে যদি পৃথক ও অসম্পূর্ণ নিয়মকানুন তৈরি হতে থাকে, তাহলে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাবে। সেই ফাঁক ব্যবহার করতে পারে সাইবার অপরাধী, সন্ত্রাসী সংগঠন কিংবা এমন রাষ্ট্র, যারা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে কাজ করতে প্রস্তুত।
জৈব নিরাপত্তায় এখনই পদক্ষেপ জরুরি
এখানে সরকারের দায়িত্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে জৈব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছানির্ভর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ডিএনএ সংশ্লেষণসহ জৈব গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও উপকরণ ব্যবহারে বাধ্যতামূলক যাচাইব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অন্য দেশগুলোকেও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
ন্যাটোর মতো নিরাপত্তা জোটগুলোরও জৈব নিরাপত্তাকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ভবিষ্যতের হুমকি প্রতিরোধে গবেষণা, নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।
বন্দর ও বিমানবন্দরে বর্জ্যজল পরীক্ষা চালু করা এমন একটি পদক্ষেপ হতে পারে, যার মাধ্যমে সংক্রামক রোগের উপস্থিতি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা সম্ভব। পরে এই নজরদারি দেশের অভ্যন্তরে বিস্তৃত করা গেলে নতুন সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত ও অনুসরণ করা সহজ হবে।
এ ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত। কারণ একবার কোনো বিপজ্জনক জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কার্যকর।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তাই এআইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে চলা। প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো যাবে না, কিন্তু তার অপব্যবহারের পথ সংকুচিত করা যায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে যেমন সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে দ্রুত প্রস্তুতি নিতে হবে, তেমনি সরকারগুলোকেও জৈব নিরাপত্তা ও এআই নিয়ন্ত্রণে আর অপেক্ষা করা চলবে না।
কারণ সতর্কবার্তাগুলো এখন যথেষ্ট স্পষ্ট। প্রযুক্তি এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে; আইন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় তার পেছনে পড়ে আছে। এই ব্যবধান যত বাড়বে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকাতে সবচেয়ে বড় ভুল হবে—বিপদ নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষা করা।
উইলিয়াম হেগ 


















