তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করার পাঁচ বছর পূর্ণ করেছে। এই সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এমনভাবে বদলে দেওয়া হয়েছে যে নারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো নীতির বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ, নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া, জনপরিসরে চলাফেরায় বিধিনিষেধ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত করার মাধ্যমে তালেবান যে ব্যবস্থা তৈরি করছে, তার লক্ষ্য শুধু বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়—ভবিষ্যৎ আফগান সমাজকেও নিজেদের আদর্শে গড়ে তোলা।
কিন্তু এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে উঠছে সেই জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই, যাদের নিশ্চুপ করে দেওয়াই তালেবানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আফগান নারীরা রাস্তায় প্রতিবাদ করেছেন, গোপনে মেয়েদের পড়িয়েছেন, ছোট ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং দেশের ভেতরে ও প্রবাসে এমন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন, যা একদিন একটি অধিকতর বহুত্ববাদী ও স্থিতিশীল আফগানিস্তান পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো এই প্রতিরোধের কৌশলগত গুরুত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে, কিন্তু নারীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক পরামর্শে। বিদেশি সরকারগুলো স্থিতিশীলতা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার মতো তাৎক্ষণিক স্বার্থকে সামনে রেখে কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। এতে তালেবানের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা যাচ্ছে: নারীদের ওপর দমন-পীড়নের রাজনৈতিক মূল্য কমে আসছে।
এ পথ শুধু নৈতিকভাবে সমস্যাজনক নয়, কৌশলগতভাবেও ভুল।
পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা: দমন নীতিতে কোনো পরিবর্তন নেই
তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর যে দ্রুততার সঙ্গে নারীদের অধিকার সংকুচিত করেছিল, তা ছিল গত দুই দশকের অগ্রগতির প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী যাত্রা। ২০০১ সালের পর আফগানিস্তানে নারীদের শিক্ষা ও পেশাগত অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছিল। একটি প্রজন্মের নারী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। চিকিৎসক, আইনজীবী, বিচারক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও রাজনীতিক হিসেবে তারা জনজীবনে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছিলেন। সংসদেও নারীরা একসময় উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব অর্জন করেছিলেন।
তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পর সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই বিলুপ্ত বা অকার্যকর হয়ে পড়ে। নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা হয়। নারী আশ্রয়কেন্দ্র বিলুপ্ত করা হয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জনসেবা ও চলাফেরায় একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। ২০২৪ সালের ‘গুণের প্রচার ও পাপ প্রতিরোধ’ আইন এই নিয়ন্ত্রণকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। নারীদের পোশাক, আচরণ, চলাফেরা ও সামাজিক উপস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়াতে হাজার হাজার নৈতিকতা পরিদর্শক মোতায়েন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি সাময়িক কোনো নীতি নয়। সময়ের সঙ্গে তা আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে।
এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তালেবানের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করলেই তারা ধীরে ধীরে মধ্যপন্থী হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশার পক্ষে গত পাঁচ বছরে খুব কম প্রমাণ পাওয়া গেছে। বরং যেখানে আন্তর্জাতিক চাপ কমেছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।
নারীরা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
তালেবানের বিরুদ্ধে আফগান নারীদের প্রতিরোধকে শুধু মানবাধিকার আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য মানবসম্পদ, জ্ঞান, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখার সংগ্রাম।
তালেবানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামো যখন মেয়েদের বাদ দিচ্ছে এবং তরুণদের একটি কঠোর মতাদর্শিক পরিবেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন গোপন শিক্ষাকেন্দ্রগুলো অন্য ধরনের ভবিষ্যৎ রক্ষার চেষ্টা করছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। পেশাগত জীবন থেকে বাদ পড়া নারীরা নিজেদের ছোট উদ্যোগ গড়ে তুলছেন। কোথাও তারা স্থানীয় তালেবান কর্মকর্তা বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবসা চালু রাখার চেষ্টা করছেন, কোথাও শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন।
এই কাজগুলো হয়তো আজ আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিতে পারছে না। কিন্তু এগুলো এমন একটি সামাজিক অবকাঠামো ধরে রাখছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলে অত্যন্ত মূল্যবান হবে।
একটি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন শুধু নতুন সরকার গঠন করে সম্ভব হয় না। প্রয়োজন দক্ষ মানুষ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা, পেশাগত নেটওয়ার্ক, নাগরিক সংগঠন এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনগোষ্ঠী। আফগান নারীরা আজ এসবের অনেকটাই সংরক্ষণ করছেন।
তাই তাদের প্রতিরোধকে সহায়তা করা দাতব্য কাজ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগ।
কূটনৈতিক স্বাভাবিকীকরণের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান নীতিতে একটি বড় দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। একদিকে বিভিন্ন সরকার তালেবানের নারীনির্যাতনের নিন্দা করছে, অন্যদিকে একই সরকারগুলো কাবুলের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।
রাশিয়া তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। চীন তালেবান-নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছে। এ অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশ কাবুলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। ইউরোপীয় পর্যায়েও তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
কাবুলের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগই যে সবসময় এড়িয়ে চলা সম্ভব, এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। সন্ত্রাসবাদ, মানবিক সহায়তা, সীমান্ত, শরণার্থী ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যোগাযোগ আর বৈধতা দেওয়া এক বিষয় নয়।
আন্তর্জাতিক সরকারগুলোর উচিত এই পার্থক্য স্পষ্ট রাখা।

তালেবানকে আফগান জনগণের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেওয়া মানে এমন একটি রাষ্ট্রীয় দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া, যেখানে দেশের অর্ধেক মানুষ রাজনৈতিকভাবে প্রায় অদৃশ্য। কোনো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভিত্তি এমন হতে পারে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তালেবানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লেও তাদের আচরণ নরম হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণেও আল-কায়েদার সঙ্গে তালেবানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে এবং আফগানিস্তানে বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের উপস্থিতি অব্যাহত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, কাবুলের সঙ্গে সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগ রাখা যেতে পারে, কিন্তু এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয় যা তালেবানকে রাজনৈতিক বৈধতার অনুভূতি দেয় এবং একই সঙ্গে নারীদের ওপর দমন-পীড়নের মূল্য কমিয়ে দেয়।
কূটনীতির টেবিলে নারীদের জায়গা কোথায়
আফগানিস্তান নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিগুলোর একটি হলো—তালেবানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার টেবিলে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, অথচ তালেবান যাদের জনজীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে, সেই নারীরা অনেক সময় সেই টেবিলের বাইরে থাকছেন।
এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনায় আফগান নারীদের আনুষ্ঠানিক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু আলাদা বৈঠক করে মতামত নেওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের এমন জায়গায় থাকতে হবে যেখানে সিদ্ধান্তের বিষয় নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনায় তাদের মতামতের বাস্তব প্রভাব থাকবে।
ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির নজির রয়েছে, যখন কোনো রাষ্ট্রের একটি বড় জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত ছিল এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উপায়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। আফগানিস্তানেও একই ধরনের সৃজনশীল কূটনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
জাতিসংঘ চাইলে আফগান নারীদের জন্য এমন একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তারা সরাসরি অংশ নেবেন। এর মাধ্যমে একটি মৌলিক বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে: তালেবান ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু আফগান জনগণের একমাত্র রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হওয়ার দাবি করতে পারে না।
মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
আফগান নারীদের প্রতিরোধ টিকে থাকতে হলে নৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি বাস্তব সম্পদ প্রয়োজন। এখানেই আন্তর্জাতিক দাতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় আফগান নারীদের নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক সংগঠনের অর্থায়ন কমলে ক্ষতিটা শুধু বর্তমানের নয়। এতে ভবিষ্যতের প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক অনুদান দিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলন চালানো কঠিন। সংগঠনগুলোকে কয়েক বছরের জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থায়ন দেওয়া হলে তারা কর্মী ধরে রাখতে, গবেষণা করতে, স্থানীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতে পারবে।
বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা এবং পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। স্বীকৃত অনলাইন ও সরাসরি শিক্ষা, বৃত্তি, প্রতিবেশী দেশগুলোতে পেশাগত ফেলোশিপ, বিদেশে শিক্ষার সুযোগ, ভিসা সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি—এসব উদ্যোগ তালেবানের বর্তমান বিধিনিষেধের মধ্যেও মানবসম্পদ রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও আফগান নারীদের কথা শুনতে হবে। বাইরে বসে কোনো সরকার আফগান নারীদের জন্য কী প্রয়োজন তা একতরফাভাবে নির্ধারণ করলে আবারও সেই পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে—তাদের নিয়ে নীতি তৈরি হবে, কিন্তু তাদের সঙ্গে নীতি তৈরি হবে না।
শরণার্থীদের সুরক্ষা মানে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষা
আফগান নারীদের একটি বড় অংশ এখন দেশের বাইরে। তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎও আফগানিস্তানের পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত।
ইরান ও পাকিস্তান থেকে আফগানদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঘটনা বিশেষ উদ্বেগের। যারা তালেবানের নিপীড়ন থেকে পালিয়েছে, তাদের আবার এমন একটি পরিবেশে ফেরত পাঠানো তাদের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের জন্য এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
যেসব দেশের কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তাদের উচিত জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধের জন্য চাপ দেওয়া। একই সঙ্গে যেসব দেশ বিপুলসংখ্যক আফগান শরণার্থী গ্রহণ করছে, তাদেরও আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো দরকার।
কারণ প্রবাসী আফগান সমাজ শুধু শরণার্থীদের সমষ্টি নয়। সেখানে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে আফগান রাষ্ট্র পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
২০০১ সালের পর আফগানিস্তান পুনর্গঠনের সময় প্রবাসী ও শরণার্থী সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা যেমন কাজে লেগেছিল, ভবিষ্যতেও তেমন প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দায়
আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দায় অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। দুই দশকের আন্তর্জাতিক উপস্থিতিতে বহু আফগান নারী ও নাগরিক সমাজের সদস্য মার্কিন প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করেছেন। তারা মানবাধিকার, গণতন্ত্র, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টায় যুক্ত ছিলেন।
তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর তাদের অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ তৃতীয় দেশে আটকে আছেন, কেউ নিরাপত্তাহীন অবস্থায় অপেক্ষা করছেন।
বিশেষ করে যেসব নারী তালেবানের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন বা মানবাধিকার রক্ষায় সক্রিয় ছিলেন, তাদের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসনের পথ খোলা রাখা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি পূর্বের আন্তর্জাতিক নীতির ধারাবাহিকতার প্রশ্নও।
যে প্রজন্মকে একসময় গণতান্ত্রিক ও নাগরিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল, তাদের পরিত্যাগ করা হলে ভবিষ্যতে কোনো জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির ওপর কতটা আস্থা রাখবে, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
জবাবদিহির পথ বন্ধ করা যাবে না
তালেবানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের অপরাধের প্রমাণ আগামী দিনের আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তি হতে পারে।

জাতিসংঘের তদন্ত ব্যবস্থা, আফগানিস্তানবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের কার্যালয় এবং আফগান নারীদের নেতৃত্বে পরিচালিত তথ্যসংগ্রহ উদ্যোগগুলোর জন্য স্থায়ী অর্থায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনে নারীদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টাও কূটনৈতিক সমর্থন দাবি করে।
আন্তর্জাতিক আইনে ‘জেন্ডার পারসিকিউশন’ বা লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের ধারণা ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। আফগান নারীদের সংগঠনগুলো এখন আরও এগিয়ে ‘জেন্ডার অ্যাপারথাইড’কে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।
এই প্রচেষ্টা শুধু আইনি পরিভাষা নিয়ে বিতর্ক নয়। একটি রাষ্ট্র যখন নারীদের স্থায়ীভাবে জনজীবন থেকে সরিয়ে দেয়, তখন সেই ব্যবস্থাকে যথাযথ ভাষায় চিহ্নিত করা নিজেই রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। কারণ কোনো ব্যবস্থার প্রকৃতি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেলে সেটিকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা
আফগান নারীদের আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর অতীত নীতির একটি অস্বস্তিকর সম্পর্ক রয়েছে।
২০০১ সালের পর দুই দশক ধরে নারীর শিক্ষা, পেশাগত অগ্রগতি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু তালেবানের সঙ্গে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতে অনেক সময় সেই নারীরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে ছিলেন না, যাদের অধিকারকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এখন তালেবান যখন একটি কঠোর ও বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।
এর অর্থ এই নয় যে বাইরের শক্তি আফগান নারীদের ‘উদ্ধার’ করবে। এমন ধারণা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি আফগান নারীদের নিজেদের সংগ্রামের সক্ষমতাকেও খাটো করে। তাদের প্রয়োজন এমন আন্তর্জাতিক অংশীদার, যারা তাদের হয়ে কথা বলার বদলে তাদের নিজেদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করবে।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ আফগান জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ যদি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তই দীর্ঘস্থায়ী বৈধতা অর্জন করতে পারবে না।
নারীদের প্রতিরোধ তাই কেবল তালেবানবিরোধী আন্দোলন নয়। এটি একটি ভিন্ন আফগানিস্তানের সম্ভাবনা ধরে রাখার চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তালেবানকে কীভাবে বদলানো যাবে, তা নয়
গত পাঁচ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এখানেই: আন্তর্জাতিক নীতির লক্ষ্য শুধু তালেবানকে কিছু বিষয়ে সহযোগিতায় রাজি করানো হলে চলবে না। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি আফগানিস্তানের সম্ভাবনা সংরক্ষণ করা, যেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ একটি গোষ্ঠীর মতাদর্শ দিয়ে নির্ধারিত হবে না।
তালেবানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ থাকতে পারে। মানবিক সহায়তাও অব্যাহত রাখতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ে আলোচনা করতেও হবে। কিন্তু এসবের কোনোটি যেন নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার বিসর্জনের বিনিময়ে না হয়।
আফগান নারীদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা শুধু প্রতিবাদ করছেন না; তারা ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপাদানগুলোও ধরে রাখছেন। তারা শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, সংগঠন তৈরি করছেন, তথ্য সংরক্ষণ করছেন, পেশাগত দক্ষতা টিকিয়ে রাখছেন এবং দেশের ভেতরে-বাইরে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছেন।
একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান একদিন তৈরি হবে কি না, তার নিশ্চয়তা আজ কেউ দিতে পারে না। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব করার জন্য যে মানুষগুলো এখনো কাজ করছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
এটি আফগান নারীদের জন্য সমর্থন যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেরও প্রশ্ন। কারণ একটি শান্তিপূর্ণ, বহুত্ববাদী ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম আফগানিস্তান শুধু আফগানদের প্রয়োজন নয়; পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ।
তালেবান হয়তো আজ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে থাকে না। ভবিষ্যৎ তৈরি হয় সেই মানুষদের মধ্যেও, যারা সবচেয়ে কঠিন সময়ে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রতিষ্ঠান ও আশাকে বাঁচিয়ে রাখে।
আজকের আফগান নারীরা ঠিক সেই কাজটিই করছেন।
তাদের পাশে দাঁড়ানো মানে তালেবানের বিরুদ্ধে আরেকটি রাজনৈতিক প্রকল্প তৈরি করা নয়। বরং আফগান জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার ক্ষমতাটি টিকিয়ে রাখা। এবং শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; সেটি গড়ে তুলতে হয় সেই দেশের মানুষের হাতেই।
রিনা আমিরি 


















