যুক্তরাজ্যে খরা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠলেও পানি সংকট মোকাবিলায় পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশ করছে না সরকার। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এসব পরিকল্পনা গোপন রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সরকারকে স্বচ্ছতার অভাব ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধারে পানির স্তর এখন ‘অস্বাভাবিকভাবে কম’। ইংল্যান্ডের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং পুরো ওয়েলস খরাকবলিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে খরা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
ভয়াবহ খরায় কী হতে পারে
২০২৭ থেকে ২০৩২ সালের জন্য প্রস্তাবিত খরা পরিকল্পনায় সংকটের বিভিন্ন মাত্রা মোকাবিলার কথা প্রকাশ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে গেলে রাস্তায় অস্থায়ী পানির কল বসানো থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পানি সরবরাহের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে এসব প্রকাশ্য পরিকল্পনার পাশাপাশি পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা জরুরি খরা পরিকল্পনাও তৈরি করতে হয়। সেই পরিকল্পনাগুলোই জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না।
পানি শিল্পসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, এসব পরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার বলছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই পরিকল্পনাগুলো গোপন রাখা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পরিস্থিতি
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরাপের পানি, নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা বিষয়ক প্রধান অ্যালিস্টেয়ার চিশলম বলেছেন, জলবায়ু সংকটের কারণে ঘন ঘন এবং তীব্র খরা এখন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে হতে পারে।
তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের ২০১৮ সালের ‘ডে জিরো’ পরিস্থিতির উদাহরণ দেন। ভয়াবহ খরায় শহরটির লাখ লাখ পরিবার চরম পানি সংকটের মুখে পড়েছিল। পানীয় জল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল এবং এর সামাজিক প্রভাবও ছিল ব্যাপক।
রাজকীয় আবহাওয়া সমিতির প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক লিজ বেন্টলি অবশ্য জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তকে যুক্তিসংগত মনে করেন। তাঁর মতে, তীব্র খরার কারণে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।

শিল্প ও খাদ্য নিরাপত্তায় চাপ
ইতোমধ্যে ইংল্যান্ডের সাসেক্স, কেমব্রিজশায়ার, সাফোক ও নরফোকে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে আবাসন ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন প্রকল্প বিলম্বিত হয়েছে। পুরোনো ও অপর্যাপ্ত পানি অবকাঠামোও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পানি সংকটের প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তাতেও পড়ছে। তাপপ্রবাহ, খরা ও যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
একই সময়ে পানিনির্ভর শিল্পের চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বৃহৎ তথ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ পানি প্রয়োজন। পানি শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ওয়াটার ইউকে সরকারকে একটি অগ্রাধিকার কাঠামো প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে চরম পানি সংকটে কোন খাত আগে পানি পাবে তা নির্ধারণ করা যায়।
তথ্যকেন্দ্র নিয়ে নতুন বিতর্ক
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল অ্যাকশন প্ল্যানের ওলিভার হেইস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, খরার সময় বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্যকেন্দ্রগুলোকে অন্য খাতের তুলনায় বেশি পানি দেওয়া হতে পারে। তাঁর মতে, সরকারের গোপনীয়তা মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিও জরুরি খরা পরিকল্পনা জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখাকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ভবিষ্যতের ভয়াবহ পানি সংকট ঠেকাতে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত।
এর মধ্যেই পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফওয়াট খরার সময় পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকদের বিল বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
জাতীয় পানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার দাবি
রিভার অ্যাকশনের প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যামি ফেয়ারম্যান সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে পানি সংকট মোকাবিলার জন্য সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনার অভাবই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
সরকারের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, জরুরি খরা পরিকল্পনাগুলো প্রকাশ্য বিধিবদ্ধ খরা পরিকল্পনার অতিরিক্ত ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার কারণেই এগুলো প্রকাশ করা হবে না।
তবে পানি ইউকের বক্তব্য, প্রতিটি পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব খরা পরিকল্পনা প্রকাশ করে এবং সেখানে খরার প্রতিটি ধাপে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা উল্লেখ থাকে। চরম খরার ক্ষেত্রে কোন খাতকে কীভাবে পানি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলেও সংগঠনটি মনে করে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















