রেজিম চেঞ্জ-২.০
আপাতত আমেরিকার ইরান আক্রমণ করার কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো সামনে আসছে – এক. সিভিলাইজেশন ধ্বংসের ধারাবাহিকতা। দুই. কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে নিজ দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া। তিন. আগামী ৩১ মার্চ থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যবসায়িক ডিলসহ ট্রাম্পের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনায় বসার আগে চীনের অর্থনৈতিক সহযোগী পানামা, ভেনেজুয়েলার পর ইরানের রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তন। চার, এর ভেতর দিয়ে বাড়তি পাওয়া এই যুদ্ধের সহযোগী হিসেবে পাকিস্তানকে ব্যবহার করে আফগানিস্তানের বাগমার এয়ার বেস দখল করা।
আর এ জন্য ইরানের রেজিম চেঞ্জ-২.০। কোনো বহিরশক্তি, তার সহযোগী বা কোনো কোম্পানির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় সহিংস পদ্ধতিতে রেজিম চেঞ্জ-২.০ পরবর্তী ওই দেশের অবস্থা কী হয় তা বাংলাদেশের মানুষ “২.০” বা “দ্বিতীয় স্বাধীনতার” ফল এখন প্রত্যক্ষ করছে। ৬.৭ থেকে জিডিপি নেমে ২.৯৮ অর্থাৎ বিখ্যাত থ্রি জিরোর দিকে। তাই সহিংস বা বহিরশত্রুর দ্বারা রেজিম চেঞ্জ হলে স্বাভাবিক কি ঘটে তা শুধু বাংলাদেশে নয় ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে আরো বড় প্রমাণ রয়েছে। যেমন ইরাক, মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া। আর এই দেশগুলো শুধু একটা দেশ নয়, এক একটি সিভিলাইজেশন।

কেন সিভিলাইজেশন ধ্বংস করা হয়
বাস্তবে রাষ্ট্র একটি কাঠামো। সম-সাময়িক সময়ের প্রয়োজনেই এক একটি রাষ্ট্র একেক ধরনের কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু সিভিলাইজেশন মূলত ওই ভূখণ্ডের অন্তর্নিহিত শক্তি। যা কোনো সম-সাময়িক বিষয় নয়। হাজার হাজার বছর ধরে চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। এই শক্তি অনেকটা মানুষের ডিএনএ’র মতো একটি জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক পরম্পরা। এবং এটাই তার সহজাত শক্তি। কোনো কারণে ওই ভূখণ্ডের কিছু মানুষ ভুল করে যদি ভিন্ন ধরনের রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলে বা ওই সিভিলাইজেশনের সহযাত্রী নয় এমন কিছু রীতি নীতির নামে মানুষের ওপর চাপাতে থাকে। ওই ভূখণ্ডের মানুষ নিজেই সেটা পরিবর্তন করে নেয়। হয়তো এর জন্যে দশ, বিশ, তিরিশ বছর যায়। যা একটি মানুষের জন্য অনেক সময়, কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য কালপরিক্রমায় বিন্দুমাত্র। পরিবর্তন, গ্রহণ, পরিমার্জন, ধৈর্য এসবই সিভিলাইজেশনের শক্তি, রাষ্ট্রের নয়।
সুদূর অতীতেও বহু সিভিলাইজেশন ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে এমন যুদ্ধের মাধ্যমে। কিন্তু তখন যুদ্ধাস্ত্রের মাত্রা ছোট থাকায় গোটা জনগোষ্ঠীকে পঙ্গু করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সমরাস্ত্রের উন্নতি ও অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে এখন গোটা জনগোষ্ঠীকে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। যা ঘটেছে, ইরাকে, মিশরে ও সিরিয়ায়।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস
ট্রাম্প যে ট্যারিফ ভিত্তিক অর্থনীতি গ্রহণ করেছেন- এটা তার যৌবনে যে পৃথিবী ছিল ওই পৃথিবীর অর্থনীতিতে হয়তো সঠিক হতে পারত। কিন্তু গ্লোবালাইজেশনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবী যে অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে- এ সময়ে এটিকে অচলই বলা যায়। যার ফলে গত এক বছরের বেশি সময়ে পৃথিবীর অর্থনীতি যেমন ওলট পালট হয়েছে তেমনি তার নিজ দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া পৃথিবীতে যখন নতুন শক্তির উত্থান ঘটতে থাকে সে সময়ে পুরনো শক্তি যত কঠোরতার পথ নেয় ততই তার জন্যে ক্ষতিকর হতে থাকে। এই ক্ষতির কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কয়েকটি জরিপ অনুযায়ী ৩৯% এ নেমে এসেছে।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় যখন এ ধরনের ধস নেমেছে সে সময়েই তার সামনে কংগ্রেসের ইলেকশন। সাধারণত যখন কোনো নেতা নিজ দেশে ব্যর্থ হয় তখন বিদেশে তার ভিন্ন ভাবমূর্তি বা বিজয়ী ভাবমূর্তি গড়ে নিজ দেশের ওই সমস্যা কাটাতে চায়। ট্রাম্প সেই পথই নিয়েছে। কারণ কয়েকটি ওপিনিয়ন পোলে দেখা যাচ্ছে যুদ্ধ পছন্দ করছে না চারের মধ্যে দুইয়ের কিছু বেশি অংশ। অন্যদিকে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন আমেরিকাতে এ মুহূর্তে সমান সমান।
চীনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগে
ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই পানামা ক্যানেলের ওপর থেকে চীনের আধিপত্য সরিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে। অপারেশন রিজলভড এর মাধ্যমে চীনের টেকনোলজিকে পাল্লা দিয়ে ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার করে সেখানে রেজিম চেঞ্জ করতে সমর্থ হয়েছে। এবার চীনের বড় অর্থনৈতিক পার্টনার ইরানের রেজিম চেঞ্জ করে যদি ৩১ মার্চ বা ১ এপ্রিলে চায়নার প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে বসতে পারেন- তখন স্বাভাবিকই শি চাপে থাকবেন। এমনটিও ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হতে পারে। এমনকি তাইওয়ান নিয়েও চীন সংযত হবে আমেরিকার প্রতি- এটাও ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হতে পারে। পাশাপাশি অপর দুই আঞ্চলিক বড় অর্থনীতি ভারত ও রাশিয়াও যেহেতু ইরানের অর্থনৈতিক পার্টনার, তাদের জন্য একই বার্তা যাবে।

বাগমার এয়ার বেস
পাকিস্তানের ক্ষমতার মূল ব্যক্তি ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনীরকে ট্রাম্প আদর করে পুষছেন শুধু পাকিস্তানের খনিজ স্বনামে ও বনামে নেওয়ার জন্য নয়- আরো অনেক কাজে তাকে ব্যবহার করা হবে তার প্রমাণ- ইরান যুদ্ধের একদিন আগেই পাকিস্তানকে দিয়ে স্ট্রাইক করানো হলো আফগানিস্তানে। উপলক্ষ্য জঙ্গি থাকলেও মূল লক্ষ্য যে বাগমার এয়ার বেস তা এখন পরিষ্কার।
মূল যুদ্ধ ও গ্রাউন্ডে আমেরিকান-ইসরাইলি সৈন্য
এই লেখা যখন লিখছি তার ১২ ঘণ্টা আগে ট্রাম্প বলেছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল যুদ্ধ শুরু হবে। এবং তার ২৪ ঘণ্টা আগে ইরানের মূল নেতা খামেনি নিজ অফিস-কাম বাস ভবনে পরিবার পরিজনসহ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে লেখা যখন লিখছি, তার ঠিক বারো ঘণ্টা আগে আমেরিকা ঘোষণা করেছে তারা আরো সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ভেতর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধ গ্রাউন্ডে যেতে পারে। যুদ্ধের গতি শুধু মাত্র স্ট্রাইক থেকে গ্রাউন্ডের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার ভেতর দিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়, খামেনিকে হত্যা করার পরেও আমেরিকার পক্ষে “রেজিম চেঞ্জ ২.০” করার জন্যে ইরানের রাস্তায় লোক নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে হয়তো এখন “রেজিম চেঞ্জ ২.০” করার জন্য ইরাকের পথ ধরা হচ্ছে।

কেন এই হিসাবের গরমিল
এ মুহূর্তে যতদূর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের ধারণা ছিল, খামেনিকে হত্যা করতে সমর্থ হলে খামেনি শাসনের পরিবর্তন যারা চায় সেই ইরানিরা বিজয় উল্লাসে রাস্তায় নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ইরানের রাস্তায় বা নানান স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করছে বলে মানুষ ভয়ে রাস্তায় নামছে না। মানুষ রাস্তায় নামলে তো আর আমেরিকা ওইভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ত না বরং রাস্তার মানুষের দিকে মনোযোগী হতো।
যতদূর যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে- তা মূলত ইরানের সিভিলাইজেশনের শক্তি। অর্থাৎ ভূমি কালচার নির্ভর ইরানের শিয়া জনগোষ্ঠীর একজন নেতা খামেনিকে সপরিবারে হত্যার পরে- বিভেদের বদলে শিয়া জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেছে হয়তো। যে কারণে গার্ড রেজিমেন্ট আর সাধারণ সেনাবাহিনীর মধ্যে ভাঙন ধরানো সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে এখন গ্রাউন্ডের দিকে নজর। আর যদি এ পথে যায় তাহলে গ্রাউন্ডেও যুদ্ধটা অনেক কঠিন হবে।
অন্যদিকে খামেনির মৃত্যুর প্রথম দিনে রাশিয়ার পক্ষ থেকে খামেনি হত্যাকে নিন্দা করা এবং দ্বিতীয় দিনে এসে চীনের আরো শক্তভাবে এ হত্যার নিন্দা করাও ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরানের যুদ্ধটা শক্ত হওয়ার পথেই চলেছে- শর্টকাট পথ এখানে হয়তো আমেরিকার জন্য নেই।

ইরানের নতুন পদ্ধতি, যা ভবিষ্যতের মিত্রদেরকেও ভাবাবে
আমেরিকা তার ন্যাচারাল অ্যালি ইসরাইলকে নিয়ে যখন ইরান আক্রমণ করেছিল তখন ধারণাটা ছিল যুদ্ধটা ইরান, ইসরাইল ও আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এবং দ্রুত ইরানের রাস্তায় মানুষ নেমে রেজিম চেঞ্জ ২.০ করবে। কিন্তু খামেনি নিহত হওয়ার আগেই ইরান এক বিস্তৃত যুদ্ধ শুরু করে। যার মূল লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মিত্রদের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। এবং ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ইতোমধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেছে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমানের অর্থনীতি। এবং যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে ততই এই এলাকার অর্থনীতি- যার সঙ্গে আমেরিকা সহ বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি নানানভাবে জড়িত, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জুলিয়াস সিজার সৃষ্ট সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে- অর্থনৈতিক অবরোধ যুদ্ধ গত চার বছর ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে আসছে আমেরিকা। সেটা অবশ্য ঘোষণা দিয়ে। ইরান সেই অর্থনৈতিক অবরোধ অনেকটা বিস্তৃত আকারেই করেছে প্রতিবেশী আমেরিকার মিত্র দেশগুলোতে কয়েকটি মিসাইল ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখে। এবং তা শুধু অর্থনীতি নয়, সৌদি, কাতার ও কুয়েতে এম্বাসি বন্ধ করে দিয়ে তার ভিন্ন কার্যকারিতার প্রমাণ পৃথিবীর সামনে উন্মুক্ত করা ছাড়া আমেরিকার ভিন্ন পথ ছিল না।
হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি তেলের দাম
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বা সেখানে ঝুঁকি থাকায় প্রতিদিন ৮০ লাখ ব্যারেল থেকে এক কোটি ব্যারেল তেল রফতানি ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। ওপেক্স প্লাস এর উপসাগরীয় কয়েক দেশের তেল রফতানির বড় টুকুই এ প্রণালীর ওপর নির্ভর করে। ইতোমধ্যে ক্রুড ওয়েলের ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলার ছুঁয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে আগামী এক সপ্তাহ এই সংঘাত চললে এই জ্বালানি তেলের দাম ২০ ডলার বাড়তে পারে।
আবার যদি ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, এবং যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর তেল উৎপাদন ও রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্রুড ওয়েলের দাম ১৫০ ডলার হতে পারে।

জ্বালানি তেল ও বিশ্ব অর্থনীতি
নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও বাদ যায় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমেরিকার শেয়ার বাজারেও ইতোমধ্যে ইরান যুদ্ধ ও তেলের দামের প্রভাব পড়েছে। তাই ইরানের “ইসলামিক রিপাবলিক-২.০” করার নামে যদি ইরানকে আরো জটিলতায় ঠেলে দেওয়া হয়, সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যকে- তাহলে আমেরিকার অর্থনীতিও সংকটে পড়বে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে। আর যদি রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রীর কথা সঠিক হয়, “আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে ইরানের এই যুদ্ধ একটি দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ হতে চলেছে”- তাহলে ইরান যুদ্ধ কোভিড পরবর্তী অর্থনীতির জন্য আরো বড় কোভিডের মতো কারণ হতে পারে। যা মানব সৃষ্ট বা আমেরিকা সৃষ্ট বিপর্যয়।
অনেকে বলতে পারেন, ট্রাম্প সৃষ্ট না বলে আমেরিকা সৃষ্ট কেন বলা? বাস্তবে ট্রাম্প যে কাজগুলো করছেন, তিনি রাজার মতো করছেন। সংবিধানের তোয়াক্কা করছেন না। অন্যরা একই কাজ করেন সংবিধানের নামে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 

















