হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমে একসঙ্গে দুটি সংকট—জ্বালানি ঘাটতি ও অতিবৃষ্টি—কৃষকদের জন্য বড় বিপদ ডেকে এনেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধানের দামের তীব্র পতন, যা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ধানের বাজারদর ভেঙে পড়েছে
স্থানীয় বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকায়, যা সরকারি নির্ধারিত দামের অর্ধেকেরও কম। সরকার প্রতি কেজি ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ১,৪৪০ টাকা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের বাধ্য হয়ে এর চেয়েও কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে ডুবে গেছে ক্ষেত
চলতি মৌসুমে ভারী বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে জেলার বিস্তীর্ণ বোরো ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় এখনও পানি নামেনি, আবার কোথাও পানি বাড়ছে, ফলে ধান কাটার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানির কারণে অনেক জমিতে যন্ত্র প্রবেশই করতে পারছে না।
জ্বালানি সংকটে থমকে যান্ত্রিক কাটাই
হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান যন্ত্রের মাধ্যমে কাটা হয়। কিন্তু এবার জ্বালানি সংকট সেই প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। বানিয়াচং উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১ হাজার লিটার। ফলে ১০৬টি কম্বাইন হারভেস্টার ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা জ্বালানি কার্ড থাকা সত্ত্বেও পাম্প থেকে তেল পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা তাদের খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ফসল কাটায় পিছিয়ে পড়া
জেলার প্রধান বোরো উৎপাদন এলাকা বানিয়াচং উপজেলায় ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম। শ্রমিক সংকটও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চাষাবাদের চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতি
চলতি মৌসুমে জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ৪৬ হাজার ৯৫৪ হেক্টর জমি, যার বড় অংশই বানিয়াচংয়ে।
এদিকে বৃষ্টিতে ছয়টি উপজেলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। বানিয়াচংয়ে ২৪৮ হেক্টর, আজমিরীগঞ্জে ১৫৪ হেক্টর, হবিগঞ্জ সদর এলাকায় ৯০ হেক্টর, লাখাইয়ে ২৫ হেক্টর, নবীগঞ্জে ২০ হেক্টর এবং চুনারুঘাটে ১৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষকের আশঙ্কা
কৃষকেরা বলছেন, পানি জমে থাকা ও জ্বালানি না পাওয়ার কারণে সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না। এতে ফলন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলের বোরো উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















