দেশের ইউরিয়া সার খাত এখন একযোগে তিনটি বড় সংকটের মুখে—গ্যাস ঘাটতি, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাঘাত এবং মূল্যবৃদ্ধি। এর ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানিও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সামনে আমন মৌসুম ঘিরে এই সংকট কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
উৎপাদন থেমে, আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে
গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি প্রধান ইউরিয়া কারখানার মধ্যে চারটি বন্ধ রয়েছে। বহুজাতিক কারখানাটিও উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ফলে এখন মোট উৎপাদন নেমে এসেছে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের নিচে।
একসময় দেশে প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া উৎপাদন হলেও এখন পরিস্থিতি উল্টো—৮০ শতাংশের মতোই আমদানি করতে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের বার্ষিক ইউরিয়া চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানির ওপর চাপ বেড়েছে, যা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

মজুদ কমে নিরাপদ সীমার নিচে
সরকারি হিসাবে দেশে ইউরিয়া সারের মজুদ এখন প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, যেখানে নিরাপদ মজুদ ধরা হয় ৪ লাখ টন।
সামনে আমন মৌসুমে প্রায় ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন ইউরিয়া প্রয়োজন—এই প্রেক্ষাপটে মজুদ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
দরপত্রে সাড়া কম: অংশগ্রহণ ও প্রস্তাবের চিত্র
২ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য দুই দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রথম দফায় কোনো প্রতিষ্ঠানই অংশ নেয়নি—অর্থাৎ শূন্য প্রতিক্রিয়া।
দ্বিতীয় দফায় মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং তারা মোট ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহের প্রস্তাব দেয়—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ২৫ হাজার টন করে।
অর্থাৎ মোট চাহিদার মাত্র ২৫ শতাংশের জন্য প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা আমদানির পরিকল্পনাকে বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট: উৎপাদন ও সরবরাহে চাপ
বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া উৎপাদন মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান ঘিরে সংঘাত, এই অঞ্চলের সার শিল্পকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
প্রথমত, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা ইউরিয়া উৎপাদনের মূল উপাদান। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ফলে উৎপাদিত সার সময়মতো আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
তৃতীয়ত, পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিক্রয়মূল্যও বেড়েছে, যা ক্রেতা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বৈশ্বিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি
আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত—এই তিন কারণে সারের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
ইউরিয়া উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম অস্থির হয়ে উঠেছে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

গ্যাস আমদানি সীমিত, সংকট আরও জটিল
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ পর্যাপ্ত গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, উচ্চ আন্তর্জাতিক মূল্য এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে গ্যাস আমদানি সীমিত হয়ে পড়েছে।
ফলে বন্ধ থাকা সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করার সুযোগও সীমিত, যা সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে।
কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রভাব
সারের সংকট সরাসরি কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। সময়মতো সার না পেলে ধানের ফলন কমে যেতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে সার আমদানি করতে হলে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে।
বিকল্প উৎস ও করণীয়

মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ বিকল্প উৎস খুঁজছে—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এসব উৎস দিয়ে পুরো চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। সীমিত গ্যাস ব্যবস্থাপনার মধ্যেও কারখানাগুলো আংশিক চালু রাখা গেলে আমদানির তুলনায় খরচ কমানো সম্ভব হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে—সার সংকট এখন শুধু একটি শিল্পখাতের সমস্যা নয়, এটি দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















