বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাকে ‘অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী’ বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেছেন, এই ধরনের ঋণ নেওয়া সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়ায় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দেয়।
শনিবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে আয়োজিত এক ছায়া সংসদ বিতর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন বাজেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরা হয়।
বাজেট ঘাটতি ও ঋণের ঝুঁকি
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এতে বাজেট ঘাটতির চাপ তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থের সরবরাহ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়।
তিনি আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘ব্যয়-সাশ্রয়ী’ করার ওপর জোর দেন এবং স্পষ্ট নীতিনির্দেশনা থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
ভর্তুকি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের আহ্বান
বর্তমান ভর্তুকি ব্যবস্থাকে অকার্যকর উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ব্যাপক ভর্তুকি অনেক সময় এমন ব্যক্তিরাও পেয়ে থাকেন, যাদের প্রকৃতপক্ষে এই সহায়তার প্রয়োজন নেই। তিনি লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালুর প্রস্তাব দেন, যেখানে কৃষি, সেচ এবং গণপরিবহন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা
তিনি সরকার পরিচালিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির প্রশংসা করলেও বাস্তব সুফল পেতে উপকারভোগী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। অতীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
কর ও জ্বালানি নীতিতে পরামর্শ
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সাময়িকভাবে ভ্যাট ও কর ছাড় দেওয়া যেতে পারে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে এর সুফল সীমিত হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করে বেকারত্ব কমানোর কথাও উল্লেখ করেন।
অর্থনীতির সামগ্রিক চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ, খেলাপি ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি জানান, জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় না করলে সরকারকে ভর্তুকিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো। প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা ক্ষতি হওয়ায় এপ্রিল মাসেই লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৩০০ কোটি টাকা। জুনের মধ্যে এই ভর্তুকি ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারত।
প্রতিযোগিতামূলক বিতর্ক ও ফলাফল
ছায়া সংসদ বিতর্কে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও ঢাকা কলেজ অংশ নেয়। বিচারকদের রায়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজ বিজয়ী হয়। অংশগ্রহণকারীদের ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদ দেওয়া হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















