এশিয়ার জেন জি প্রজন্ম এক অস্থির গ্রীষ্মের মুখোমুখি। ইতোমধ্যেই তারা দুর্বল চাকরির সুযোগ ও মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করছে। এর মধ্যেই ইরান যুদ্ধের অভিঘাত এসে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা তাদের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
এর তাৎক্ষণিক প্রভাব অর্থনৈতিক হলেও, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। এই সংকট এমন এক প্রজন্মকে আঘাত করছে, যারা বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের দুর্নীতিতে আগেই ক্ষুব্ধ ছিল এবং এখন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আরও আগ্রহী। সরকারগুলোকে তরুণদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে বাজেট আরও বাড়াতে হবে, নতুবা নতুন করে অস্থিরতার ঢেউয়ের মুখে পড়তে হবে।
গত বছর দুর্নীতি ও অভিজাত শ্রেণির সুবিধাভোগের বিরুদ্ধে জেন জি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে এই ক্ষোভ রাস্তায় বিস্ফোরিত হতে পারে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন সেই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে, বিশেষ করে যেসব অর্থনীতি হরমুজ প্রণালীর জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
অস্থিরতার লক্ষণ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। ফিলিপাইনে, যেখানে প্রায় সব অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই জ্বালানির দাম বাড়ায় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। পরিবহন শ্রমিকরা দেশজুড়ে ধর্মঘট শুরু করে এবং সরকারের কাছে বাড়তি সহায়তা দাবি জানায়। ভারতের শিল্পাঞ্চল নয়ডায় কম মজুরি ও খারাপ কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামে, যা বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে আরও তীব্র হয়েছে। পাকিস্তানেও পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা গেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তরুণ শ্রমিকরা। যুদ্ধের আগেই বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছিল যে, এই অঞ্চলে যুব বেকারত্ব বাড়ছে। অনেকেই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য, যেখানে ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো আর্থিক সুরক্ষা নেই। মজুরি যখন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, তখন স্থায়ী চাকরির সুযোগও দূরে সরে যাচ্ছে। অনেকের জন্য এটি কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা, কারণ মহামারির পর থেকেই তারা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
এই পরিস্থিতি লাখো মানুষকে আর্থিক সংকটে ঠেলে দিতে পারে। চলতি মাসে প্রকাশিত একটি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর অর্ধেকের বেশি ইরানে হলেও, পুরো অঞ্চলই এর প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেদনটি আরও জানায়, কম দক্ষ শ্রমিকদের ওপর চাকরি হারানোর প্রভাব বেশি পড়বে, ফলে তরুণদের ঝুঁকি আরও বাড়বে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, যা নতুন নিয়োগকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে।

যেসব দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কম, সেখানে চাপ আরও বেশি হতে পারে। গত বছর যেসব দেশে জেন জি-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে আবারও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা দুর্বল সরকারগুলোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নেপাল এমন একটি দেশ, যাকে বিশেষভাবে নজরে রাখতে হবে। সেখানে আন্দোলন আগের সরকার পতনে ভূমিকা রেখেছিল এবং পরবর্তীতে ভোটাররা জেন জি-সমর্থিত একজন নেতাকে নির্বাচিত করেছে। তবে জ্বালানির দাম বাড়লে সেই আশাবাদ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। শ্রীলঙ্কায়, ২০২২ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা এখন আবার খাদ্যের দাম বৃদ্ধির চাপে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে গত গ্রীষ্মে প্রাণঘাতী বিক্ষোভ হয়েছিল, সেখানে এখনও বড় অংশের শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে এবং মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় আমদানির খরচ বেড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতি এক ধরনের বিস্ফোরণমুখী অসন্তোষ তৈরি করছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক চাপকে জনরোষে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকাতে আরও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
কিন্তু উন্নয়নশীল এশিয়ার অনেক দেশের আর্থিক সক্ষমতা ইতোমধ্যেই সীমিত। ভর্তুকি বা কৃচ্ছ্রসাধন নীতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লক্ষ্যভিত্তিক আয় সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ জরুরি। যদি এই ধাক্কা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সরকারগুলোকে মূল্য নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক ও ব্যবসা সহায়তা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতে ব্যয় বজায় রাখার মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে সহায়তা দিতে জাপানের ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা ঘোষণার মতো উদ্যোগ দেখাচ্ছে, কীভাবে মধ্যম শক্তিগুলো অন্য দেশকে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে জ্বালানি অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য ও সার আমদানির জন্য জরুরি সহায়তায় আরও সমন্বয় প্রয়োজন।
এই সময় এমন বড় পদক্ষেপ নেওয়া অনেক সরকারের জন্য কঠিন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই।
নচেৎ, এই অঞ্চল এমন এক প্রজন্মকে হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে, যারা এখনো তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগই পায়নি।
কারিশমা বাসওয়ানি 



















