০৫:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
১৩ পাউন্ডের ব্রোকলি নিয়ে ক্ষোভ, ‘শো’ হয়ে যাচ্ছে খাবার—রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি নিয়ে পপি ও’টুলের তীব্র সমালোচনা সয়াবিন তেলের সংকটে বাজারে চাপ, আমদানি-ব্যাংকিং ও বৈশ্বিক দামের বড় পরীক্ষা কুড়িগ্রামে ট্রাক-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে শিশু সহ নিহত ৩, আহত অন্তত ১১ হবিগঞ্জ হাওরে জ্বালানি সংকট ও বৃষ্টির ধাক্কা: ধানের দাম অর্ধেকে নেমে কৃষকের দুশ্চিন্তা ইরান যুদ্ধ থামাবে না যুদ্ধবিরতি, বরং নতুন এক অন্তহীন সংঘাতের পথ খুলে দিল যুক্তরাষ্ট্র দুই দফা দরপত্রেও সাড়া কম, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সার বাজারে গভীর সংকট গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন দায়িত্বে ঢাবির সাবেক ভিসি নিয়াজ আহমদ খান পশ্চিমবঙ্গের ভোটে চূড়ান্ত লড়াই, কারচুপির অভিযোগে উত্তপ্ত শেষ ধাপ নাহিদ ইসলাম দুর্নীতি না করলেও নৈতিক অপরাধ করেছেন: রাশেদ খাঁনের মন্তব্যে রাজনৈতিক উত্তাপ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে আজ লড়াই, সিমিওনের দুর্গ ভাঙতে পারবে কি আর্সেনাল?

ইরান যুদ্ধ থামাবে না যুদ্ধবিরতি, বরং নতুন এক অন্তহীন সংঘাতের পথ খুলে দিল যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন আগে, একটি ইরাকি যুদ্ধবিমানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত হওয়ার পর এপিজে আম্বিকা জাহাজটির চিমনি খোওর-ই-মুসা চ্যানেলের সবুজাভ পানির ওপর ভেসে থাকতে দেখা যেত। পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরের তীরে থাকা অজানা নাবিকদের সাদা গম্বুজওয়ালা সমাধিগুলোর মতোই এই চিমনি ছিল এক নিঃশব্দ স্মারক—ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রাণ হারানো শত শত বেসামরিক নাবিকের স্মৃতিচিহ্ন। সময়ের সঙ্গে জাহাজটি কাদার ভেতর আরও গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে, আর তার সঙ্গে ম্লান হয়ে যায় সেই স্মৃতি। সংসদে আম্বিকার ডুবির ঘটনা আলোচনা হলেও গ্রেট ইস্টার্ন শিপিংয়ের ‘জ্যাগ পারি’-তে হামলা, ‘স্পিক এমেরাল্ড’-এর ওপর আক্রমণ কিংবা জগদীশ ভগবানের মৃত্যু—যিনি একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজের আতঙ্কিত ক্রুদের গুলিতে নিহত হন—এসব ঘটনা তেমন গুরুত্ব পায়নি।

কিন্তু ভুলে যাওয়ার মানে এই নয় যে বাস্তবতা মুছে যায়। ১৯৮৪ সালে আম্বিকা ডুবে যাওয়ার প্রায় দুই দশক পর একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ওই একই চ্যানেল দিয়ে যাওয়ার সময় সেই ধ্বংসাবশেষে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। ধারণা করা হয়, বহুদিনের অবহেলায় পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষটি সরে গিয়েছিল এবং নৌপথের মানচিত্রে তার অবস্থান আর সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত যেন পারস্য উপসাগর—এবং গোটা বিশ্বকে—আবার সেই ভয়াবহ যুদ্ধের দুঃস্বপ্নে ফিরিয়ে এনেছে। এটি ছিল বিশ শতকের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটি, যেখানে বিষাক্ত গ্যাস ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও সেটি খুবই নড়বড়ে। কারণ ইতিহাস বলে, প্রতিটি যুদ্ধবিরতির পরই আবার সংঘাত ফিরে এসেছে।

Strait of Hormuz - Tanker War - Strauss Center

মিত্র, কিন্তু বন্ধু নয়

১৯৮১ সাল থেকে ইরান ও ইরাক পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে এক নির্মম যুদ্ধ শুরু করে। উভয় দেশই একে অপরের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে বাণিজ্যিক জাহাজ, তেল অবকাঠামো এবং বিশাল তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। ইরাক খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক পতাকাবাহী জাহাজেও আক্রমণ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ গোপন করে এবং তাকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিজেও এই রক্তক্ষয়ী নৌযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং একটি ইরান এয়ার যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন যাত্রী ও ক্রু নিহত হন।

এই ইতিহাসের অদ্ভুত দিক হলো—১৯৫৯ সাল পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও, ইরান ও ইরাক মিত্র ছিল। তারা সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যা ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সংস্করণ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। পরে ব্রিগেডিয়ার আবদুল করিম কাসিমের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর ইরাক এই জোট থেকে বেরিয়ে যায়। তবে কাসিম দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের উদ্বেগ কমাতে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন বৈশ্বিক সংঘাতের সূচনা হতে থাকে। ঠান্ডা যুদ্ধের প্রথম বড় সংকট বার্লিন বা পূর্ব ইউরোপে নয়, বরং উত্তর ইরানের পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা দেয়। ১৯৪১ সালের আগস্টে—মস্কোর দিকে নাৎসি বাহিনীর অগ্রযাত্রার মাত্র আট সপ্তাহ পর—যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে এবং লন্ডনের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা রেজা শাহ পাহলভীকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর ইরান হয়ে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে সরবরাহ পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু।

How 1980 U.S.-Soviet Iran Tensions Went to the Brink of War

সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারে জোরালো চেষ্টা চালায়। তারা যুক্তরাজ্যের মতো তেল সুবিধা এবং সমান প্রভাবক্ষেত্র দাবি করে। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও সোভিয়েতরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং চাপ সৃষ্টি করে। একসময় মনে হচ্ছিল, এই সিদ্ধান্ত ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দেবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে কুর্দি ও তুর্কিভাষী জনগোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র গঠন করে এবং কমিউনিস্ট দল তুদেহ দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

তবে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন সংঘাত থেকে সরে আসে। পূর্ব ইউরোপে নিজেদের মূল স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা ইরান ইস্যুতে পিছু হটে। পরে তারা তেলের একটি চুক্তি আদায় করলেও ইরানের সংসদ তা অনুমোদন না করায় সেটি বাতিল হয়ে যায়।

যুদ্ধের উত্তাল ঢেউ

১৯৬৮ সালে ব্রিটিশরা পারস্য উপসাগর থেকে তাদের উপনিবেশিক প্রভাব সরিয়ে নিতে শুরু করলে নতুন শক্তির লড়াই শুরু হয়। ১৯৬১ সালে কাসিমের নেতৃত্বে ইরাক কুয়েতের ওপর দাবি তোলে, যদিও ব্রিটিশ সেনা মোতায়েনের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৭১ সালে ইরান কয়েকটি দ্বীপ দখল করে।

১৯৭৪ সালে ইরান-ইরাক সংঘাত আরও তীব্র হয়। ইরান কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দেয়, আর ইরাক সীমান্তে হামলা চালায়। জাতিসংঘের চাপে একটি সমঝোতা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো সমস্যা সমাধান হয়নি।

What Iran's revolution meant for Iraq | Brookings

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সাদ্দাম হোসেন সুযোগ দেখেন। তিনি মনে করেন, আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দুর্বল এবং সেনাবাহিনী ভেঙে পড়েছে। ইরাক ইরানের দখল করা দ্বীপ ফেরত এবং খুজেস্তান অঞ্চলের আরব জনগোষ্ঠীর জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করে। পাশাপাশি শাত আল-আরব নদীপথে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও চায়।

তবে ইরাক যুদ্ধের জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল তৈরি করেনি। সাদ্দাম শুধু পারস্যের ওপর আরবদের ১,৫০০ বছরের আধিপত্য পুনরুদ্ধারের কথা বলেছিলেন। শুরুতে কিছু সাফল্য এলেও ১৯৮২ সালের মধ্যে ইরান হারানো এলাকা পুনর্দখল করে। লক্ষাধিক সৈন্য—অনেক সময় কিশোরদেরও—অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে বলি দেওয়া হয়।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে আগুন

১৯৮৪ সালের পর ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পায়। ইরাক ইরানের খার্গ দ্বীপে হামলা বাড়ায়। জবাবে ইরান সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল স্থাপনায় যাওয়া জাহাজে আক্রমণ শুরু করে। সীমিত নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও ইরান দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে হামলা চালায়। ‘সাবালান’ নামের একটি যুদ্ধজাহাজ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তেলের অভাব না থাকলেও পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীল তেলের দাম নিশ্চিত করা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। কুয়েতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ট্যাংকারে নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু প্রথম অভিযানে একটি ট্যাংকার ইরানি মাইনে আঘাত পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

When Iraqi jet Aircraft Struck an American Frigate USS Stark and Killed 37  Sailors

এরপর পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩৭ জন নিহত হয়। পরের বছর আরেকটি জাহাজ ইরানি মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত করলেও অল্প সময়ের মধ্যে ইরান এয়ারের একটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তাদের ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল তেলের দাম কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট এবং অস্ত্রের ঘাটতি।

এই বিজয়ও স্থায়ী হয়নি। দুই বছর পর সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে পরাজিত করলেও ইরাকের শিয়া অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বেড়ে যায়—যা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

২০১১ সালের মধ্যে ইরান এমন সক্ষমতা অর্জন করে যে, পারস্য উপসাগর কার্যত বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব—অথবা অন্তত এমন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব, যেখানে প্রতিপক্ষের অর্জন শেষ পর্যন্ত ক্ষতিতে পরিণত হবে।

ইতিহাসের বহু শাসকের মতোই ট্রাম্পও দ্রুত বিজয়ের মোহে পড়েছেন। কিন্তু এখন তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সেই বিজয়ের মূল্য হতে পারে অত্যন্ত চড়া।

১৩ পাউন্ডের ব্রোকলি নিয়ে ক্ষোভ, ‘শো’ হয়ে যাচ্ছে খাবার—রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি নিয়ে পপি ও’টুলের তীব্র সমালোচনা

ইরান যুদ্ধ থামাবে না যুদ্ধবিরতি, বরং নতুন এক অন্তহীন সংঘাতের পথ খুলে দিল যুক্তরাষ্ট্র

০৩:৫১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

দীর্ঘদিন আগে, একটি ইরাকি যুদ্ধবিমানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে বিধ্বস্ত হওয়ার পর এপিজে আম্বিকা জাহাজটির চিমনি খোওর-ই-মুসা চ্যানেলের সবুজাভ পানির ওপর ভেসে থাকতে দেখা যেত। পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরের তীরে থাকা অজানা নাবিকদের সাদা গম্বুজওয়ালা সমাধিগুলোর মতোই এই চিমনি ছিল এক নিঃশব্দ স্মারক—ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রাণ হারানো শত শত বেসামরিক নাবিকের স্মৃতিচিহ্ন। সময়ের সঙ্গে জাহাজটি কাদার ভেতর আরও গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে, আর তার সঙ্গে ম্লান হয়ে যায় সেই স্মৃতি। সংসদে আম্বিকার ডুবির ঘটনা আলোচনা হলেও গ্রেট ইস্টার্ন শিপিংয়ের ‘জ্যাগ পারি’-তে হামলা, ‘স্পিক এমেরাল্ড’-এর ওপর আক্রমণ কিংবা জগদীশ ভগবানের মৃত্যু—যিনি একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজের আতঙ্কিত ক্রুদের গুলিতে নিহত হন—এসব ঘটনা তেমন গুরুত্ব পায়নি।

কিন্তু ভুলে যাওয়ার মানে এই নয় যে বাস্তবতা মুছে যায়। ১৯৮৪ সালে আম্বিকা ডুবে যাওয়ার প্রায় দুই দশক পর একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ওই একই চ্যানেল দিয়ে যাওয়ার সময় সেই ধ্বংসাবশেষে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। ধারণা করা হয়, বহুদিনের অবহেলায় পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষটি সরে গিয়েছিল এবং নৌপথের মানচিত্রে তার অবস্থান আর সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত যেন পারস্য উপসাগর—এবং গোটা বিশ্বকে—আবার সেই ভয়াবহ যুদ্ধের দুঃস্বপ্নে ফিরিয়ে এনেছে। এটি ছিল বিশ শতকের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটি, যেখানে বিষাক্ত গ্যাস ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও সেটি খুবই নড়বড়ে। কারণ ইতিহাস বলে, প্রতিটি যুদ্ধবিরতির পরই আবার সংঘাত ফিরে এসেছে।

Strait of Hormuz - Tanker War - Strauss Center

মিত্র, কিন্তু বন্ধু নয়

১৯৮১ সাল থেকে ইরান ও ইরাক পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে এক নির্মম যুদ্ধ শুরু করে। উভয় দেশই একে অপরের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে বাণিজ্যিক জাহাজ, তেল অবকাঠামো এবং বিশাল তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। ইরাক খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক পতাকাবাহী জাহাজেও আক্রমণ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ গোপন করে এবং তাকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিজেও এই রক্তক্ষয়ী নৌযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং একটি ইরান এয়ার যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন যাত্রী ও ক্রু নিহত হন।

এই ইতিহাসের অদ্ভুত দিক হলো—১৯৫৯ সাল পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও, ইরান ও ইরাক মিত্র ছিল। তারা সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যা ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সংস্করণ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। পরে ব্রিগেডিয়ার আবদুল করিম কাসিমের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর ইরাক এই জোট থেকে বেরিয়ে যায়। তবে কাসিম দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ারের উদ্বেগ কমাতে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন বৈশ্বিক সংঘাতের সূচনা হতে থাকে। ঠান্ডা যুদ্ধের প্রথম বড় সংকট বার্লিন বা পূর্ব ইউরোপে নয়, বরং উত্তর ইরানের পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা দেয়। ১৯৪১ সালের আগস্টে—মস্কোর দিকে নাৎসি বাহিনীর অগ্রযাত্রার মাত্র আট সপ্তাহ পর—যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে এবং লন্ডনের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা রেজা শাহ পাহলভীকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর ইরান হয়ে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে সরবরাহ পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু।

How 1980 U.S.-Soviet Iran Tensions Went to the Brink of War

সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারে জোরালো চেষ্টা চালায়। তারা যুক্তরাজ্যের মতো তেল সুবিধা এবং সমান প্রভাবক্ষেত্র দাবি করে। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও সোভিয়েতরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং চাপ সৃষ্টি করে। একসময় মনে হচ্ছিল, এই সিদ্ধান্ত ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দেবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে কুর্দি ও তুর্কিভাষী জনগোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র গঠন করে এবং কমিউনিস্ট দল তুদেহ দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

তবে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন সংঘাত থেকে সরে আসে। পূর্ব ইউরোপে নিজেদের মূল স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা ইরান ইস্যুতে পিছু হটে। পরে তারা তেলের একটি চুক্তি আদায় করলেও ইরানের সংসদ তা অনুমোদন না করায় সেটি বাতিল হয়ে যায়।

যুদ্ধের উত্তাল ঢেউ

১৯৬৮ সালে ব্রিটিশরা পারস্য উপসাগর থেকে তাদের উপনিবেশিক প্রভাব সরিয়ে নিতে শুরু করলে নতুন শক্তির লড়াই শুরু হয়। ১৯৬১ সালে কাসিমের নেতৃত্বে ইরাক কুয়েতের ওপর দাবি তোলে, যদিও ব্রিটিশ সেনা মোতায়েনের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৭১ সালে ইরান কয়েকটি দ্বীপ দখল করে।

১৯৭৪ সালে ইরান-ইরাক সংঘাত আরও তীব্র হয়। ইরান কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দেয়, আর ইরাক সীমান্তে হামলা চালায়। জাতিসংঘের চাপে একটি সমঝোতা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো সমস্যা সমাধান হয়নি।

What Iran's revolution meant for Iraq | Brookings

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সাদ্দাম হোসেন সুযোগ দেখেন। তিনি মনে করেন, আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দুর্বল এবং সেনাবাহিনী ভেঙে পড়েছে। ইরাক ইরানের দখল করা দ্বীপ ফেরত এবং খুজেস্তান অঞ্চলের আরব জনগোষ্ঠীর জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করে। পাশাপাশি শাত আল-আরব নদীপথে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও চায়।

তবে ইরাক যুদ্ধের জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল তৈরি করেনি। সাদ্দাম শুধু পারস্যের ওপর আরবদের ১,৫০০ বছরের আধিপত্য পুনরুদ্ধারের কথা বলেছিলেন। শুরুতে কিছু সাফল্য এলেও ১৯৮২ সালের মধ্যে ইরান হারানো এলাকা পুনর্দখল করে। লক্ষাধিক সৈন্য—অনেক সময় কিশোরদেরও—অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে বলি দেওয়া হয়।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে আগুন

১৯৮৪ সালের পর ‘ট্যাংকার যুদ্ধ’ আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পায়। ইরাক ইরানের খার্গ দ্বীপে হামলা বাড়ায়। জবাবে ইরান সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল স্থাপনায় যাওয়া জাহাজে আক্রমণ শুরু করে। সীমিত নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও ইরান দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে হামলা চালায়। ‘সাবালান’ নামের একটি যুদ্ধজাহাজ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তেলের অভাব না থাকলেও পারস্য উপসাগরে স্থিতিশীল তেলের দাম নিশ্চিত করা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। কুয়েতের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ট্যাংকারে নিরাপত্তা দেয়। কিন্তু প্রথম অভিযানে একটি ট্যাংকার ইরানি মাইনে আঘাত পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

When Iraqi jet Aircraft Struck an American Frigate USS Stark and Killed 37  Sailors

এরপর পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরাকি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩৭ জন নিহত হয়। পরের বছর আরেকটি জাহাজ ইরানি মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত করলেও অল্প সময়ের মধ্যে ইরান এয়ারের একটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় তাদের ভূমিকা বিতর্কিত হয়ে ওঠে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল তেলের দাম কমে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট এবং অস্ত্রের ঘাটতি।

এই বিজয়ও স্থায়ী হয়নি। দুই বছর পর সাদ্দাম কুয়েত আক্রমণ করেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে পরাজিত করলেও ইরাকের শিয়া অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বেড়ে যায়—যা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

২০১১ সালের মধ্যে ইরান এমন সক্ষমতা অর্জন করে যে, পারস্য উপসাগর কার্যত বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব—অথবা অন্তত এমন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব, যেখানে প্রতিপক্ষের অর্জন শেষ পর্যন্ত ক্ষতিতে পরিণত হবে।

ইতিহাসের বহু শাসকের মতোই ট্রাম্পও দ্রুত বিজয়ের মোহে পড়েছেন। কিন্তু এখন তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সেই বিজয়ের মূল্য হতে পারে অত্যন্ত চড়া।