দেশের ভোজ্য তেলের বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট এখন শুধু খুচরা দোকানের তাক খালি থাকার সমস্যা নয়; এর পেছনে জড়িয়েছে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, ডলার ও এলসি ব্যয়ের চাপ, সরকারের দাম সমন্বয় নীতি এবং নতুন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বাস্তবতা।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সয়াবিন তেল আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার টনে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ লাখ ৪৮ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। একই সময়ে পাম অয়েল আমদানি প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও সেটি সয়াবিনের ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। দেশের বার্ষিক ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর—এই বাস্তবতায় আমদানি কমলেই বাজারে সরাসরি চাপ পড়ে।
বাজারে সরবরাহ সংকটের চাপ
খুচরা পর্যায়ে অনেক দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম। কোথাও কোথাও ডিলার পর্যায়ে অন্য পণ্য নেওয়ার শর্তে তেল সরবরাহের অভিযোগও উঠছে। খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দামও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোরবানির ঈদের আগে ভোজ্য তেলের চাহিদা আরও বাড়বে—তাই বর্তমান সংকট দ্রুত না কাটলে বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক দামের ধাক্কা
বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম চলতি বছর দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের পণ্যবাজার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ১৫৪ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে তা ১ হাজার ২৮২ ডলার এবং মার্চে ১ হাজার ৪৮২ ডলারে ওঠে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬ পূর্বাভাসে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম এ বছর ৮ শতাংশ বাড়তে পারে বলে বলা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে নির্ধারিত দামের কাঠামো সময়মতো সমন্বয় না হলে আমদানিতে লোকসানের ঝুঁকি থাকে। ফলে বড় আমদানিকারকরাও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। এর সঙ্গে ডলারের মূল্য ও ব্যাংকিং ব্যয় যোগ হওয়ায় আমদানি সিদ্ধান্ত আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকিং ও এলসি চাপ
দেশের ব্যাংকিং খাতে আমদানি এলসি নিষ্পত্তির ডলার দর এপ্রিলের শুরুতে ১২৩ টাকার ওপরে ওঠে। ৬ এপ্রিল এলসি নিষ্পত্তির হার ১২৩ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৪০ পয়সার মধ্যে ছিল বলে ব্যাংকিং সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আবার জ্বালানি ও বড় সরকারি আমদানি বিল পরিশোধের চাপ থাকলে ব্যাংকগুলো ডলার সংগ্রহে আরও প্রতিযোগিতায় নামে। এতে খাদ্যপণ্য আমদানিকারকদের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন দামের সঙ্গে ডলারের দর, ঋণপত্র খরচ, সুদহার, পরিবহন ও শুল্ক মিলিয়ে স্থানীয় বাজারে সয়াবিন তেলের দাম আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। এই চাপ সামাল দিতে না পারলে ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে দেন, আর তার ফল ভোক্তার ওপর পড়ে।

পাম অয়েল কেন বিকল্প হতে পারছে না
বাংলাদেশের বাজারে পাম অয়েল গুরুত্বপূর্ণ হলেও সয়াবিন তেলের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সহজ নয়। ভোক্তার অভ্যাস, প্যাকেটজাত বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবহার এবং খোলা তেলের বাজার আলাদা কাঠামোয় চলে। ফলে পাম অয়েল আমদানি প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও সয়াবিনের কমতি খুচরা বাজারে সংকট তৈরি করছে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বাস্তবতা
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় কৃষিপণ্য বড় জায়গা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য—গম, সয়া, তুলা ও ভুট্টা—আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক কাঠামো এবং কিছু তৈরি পোশাকে বিশেষ সুবিধার কথা বলেছে।
এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে সয়াবিন ও সয়া-সম্পর্কিত পণ্যের সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্য করতে পারে। তবে তাৎক্ষণিক বাজার সংকট মেটাতে শুধু চুক্তি যথেষ্ট নয়। দরকার দ্রুত এলসি খোলা, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় দামের বাস্তবসম্মত সমন্বয়, এবং বাজারে মজুত ও সরবরাহ তদারকি।

ভোক্তার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
ভোজ্য তেল বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিয়মিত খাদ্যব্যয়ের বড় অংশ। দাম বাড়লে শুধু রান্নার খরচ নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, ভাজাপোড়া খাবার, পোলট্রি ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত খাতেও ব্যয় বাড়ে। ফলে সয়াবিন তেলের সংকট শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলতে পারে।
সরকারের সামনে এখন তিনটি কাজ জরুরি—আমদানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা, বাজারে কৃত্রিম সংকট ও বাধ্যতামূলক পণ্য বিক্রির অভিযোগ কঠোরভাবে দেখা, এবং আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের বাস্তবতা মিলিয়ে নীতি নির্ধারণ করা। তা না হলে কোরবানির ঈদের আগে ভোজ্য তেলের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















