বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ মার্চের থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও গর্ব করার মতো আর কোন দিন নেই। বাঙালির ইতিহাস যারা জানেন, তারা জানেন, ওই অর্থে বাঙালির কখনও কোন স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম তার জাতি গোষ্ঠীর জন্যে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম”।
বাঙালির এই নেতা কারও কোন দয়ায় নেতা হননি। তিনি, তাঁর সহকর্মী ও তার অনুসারীরা ২২ বছরের এক সুবিশাল, সৎ ও আত্মত্যাগের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ১৯৭১ সালে এই ৭ মার্চে পৌঁছেছিলেন।
এই ৭ মার্চ ১৯৭১ এ যখন বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পৌঁছেছিলেন, ততদিনে তিনি বাঙালির কাছে আর শুধু “শেখ সাহেব”, “মুজিব ভাই” নন, তিনি “বঙ্গবন্ধু”। তাঁর সহকর্মী ও তার অনুসারী তরুণ তুর্কিরাও তখন সকলে এক এক জন নায়ক। কারণ, তাদের ইতিহাস ততদিনে শুধু ত্যাগের ইতিহাস, সাহসের ইতিহাস, বীরত্বের ইতিহাস।

আর এ বীরত্ব কোন বন্দুকের নলের বীরত্ব, কোন সহিংসতার বীরত্ব ছিল না। এ বীরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার বীরত্ব, এ বীরত্ব ছিল জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়ানো এক বীরত্ব।
১৯৪৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তার সূচনা বিন্দুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৫০ মোগলটুলি কেন্দ্রিক মুসলিম লীগের যে প্রগতিশীল তরুণ নেতারা ছিলেন যাদের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরা শুধু রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তারা সকলে ছিলেন রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে উচ্চ জ্ঞানসম্পন্ন তরুণ। পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রগতিশীল রাজনীতির মধ্যে থেকে ভিন্ন হয়েছে ঠিকই— তবে সেখানে ত্যাগ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দেশের প্রতি ভালোবাসার বিন্দুতে তারা একই ছিলেন। সকলের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্যে একটি দেশ।
বাঙালির এই “দেশ চেতনা” যে ছিল না তা নয়। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি অনেক ছোট ছোট বিদ্রোহ করেছে। সে বিদ্রোহে তার একটা সাহস ও বীরত্বের চিহ্ন পাওয়া যায়। সেই সব বিদ্রোহকে কখনও আঞ্চলিক শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক ধরনের সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এমনকি কখনও শাসক গোষ্ঠী তাদেরকে ডাকাত হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।
এমনকি আজ যে আধুনিক রাষ্ট্রভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক বা কনসেপ্টভিত্তিক জাতীয়তাবাদ— এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এই ভারতে সাহসের সঙ্গে শুরু করেছিল ব্রিটিশ আমলে বাঙালি সন্তানরা। ব্রিটিশ আমলে তাদেরকে ব্রিটিশরা “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিলেও বিনয়ের নেতৃত্বে রাইটার্স বিল্ডিং অপারেশনকে ব্রিটিশ “বারান্দা ব্যাটল” বলতে বাধ্য হয়েছিল। বালাশোরে বাঘা যতীনের একার যুদ্ধকেও তারা “ব্যাটল” বলতে বাধ্য হয়েছিল।
মাস্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম তিনদিন যে স্বাধীন ছিল এবং মাস্টারদার অনুসারীদের সঙ্গে পাহাড়ে পাহাড়ে যতগুলো যুদ্ধ ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে হয়েছিল তার সবগুলোই ইতিহাসে “যুদ্ধ” হিসেবেই পরিচিত।
এমনিভাবে বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রাম ও ব্রিটিশ আমলে তা জাতীয়তাবাদে রূপ নেওয়ায় সংগ্রামের ধারাবাহিকতা যদি ধরা হয় তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির এই হাজার বছরের সংগ্রামের “শীর্ষ বিন্দু”। হিমালয় পর্বতমালায় তিনি এভারেস্ট শৃঙ্গ।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থেকে অভিজ্ঞতায় পুষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলন ও এই ৭ মার্চে পৌঁছানোর সব থেকে বড় সাফল্য তিনি কোন বিচ্ছিন্ন সংগ্রাম, বিচ্ছিন্ন সশস্ত্রতার মধ্য দিয়ে এখানে পৌঁছাননি। তিনি সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতির প্রকৃত নেতা হিসেবে অর্থাৎ নির্বাচিত নেতা হিসেবে এই ৭ মার্চে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
তিনি যে রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র মানুষ নিয়ে এই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন— তার থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে ক্যান্টনমেন্টে, যাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তাদের প্রায় লক্ষাধিক সৈন্য ছিল। এমনকি যে জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ওই জনসভার ওপর দিয়ে ঘুরছে সামরিক হেলিকপ্টার। অথচ এই নিরস্ত্র মানুষের ঐক্যবদ্ধতার কাছে ওই সামরিক শক্তি সেদিন দিনের আলোতে ছিলো শক্তিহীন।
তাই ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে পৃথিবীর স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে ও রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোপরি মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসে অন্য একটি শীর্ষ বিন্দুতে নিয়ে যায়। যা প্রমাণ করে নিরস্ত্র মানুষ অস্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কতটা শক্তিশালী হতে পারে। ৭ মার্চ তাই বাঙালির জন্য শুধু নয় পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়, নিরস্ত্র মানুষের একটি বিজয়ী অধ্যায়।
মানুষের শক্তিতে এতটা শক্তিশালী হবার পরেও ওই শক্তিশালী নেতা সেদিন পৃথিবীর সব থেকে উদার গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিও দিয়েছিলেন। সে গণতন্ত্র ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র নয়, ন্যায়ের গণতন্ত্র। যা হয়তো ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে নতুন করে ভাবাবে, কারণ, ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নিপীড়িত জাতির স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, শুধু মুক্তির সংগ্রামের ঘোষণা করেননি, তিনি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিও দিয়ে যান, তিনি ওই ভাষণে বলেন, “কেউ যদি ন্যায্য কথা বলেন, আর তিনি সংখ্যায় যদি একজনও হন, তাহলে আমরা সেটা মেনে নেব”।
অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা শক্তির জোরে কোন বড় ছোটকে গিলে খাবে না। যতই গণতান্ত্রিক হোক, বড় যখন ছোটকে গিলে খায় তখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেহারা পৃথিবীতে কী হয় তা এ মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর মানুষ একের পর এক দেখছে।
অন্যদিকে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল এই উপমহাদেশের জন্যে একটি ভিন্ন ও অনন্য অধ্যায়। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সমগ্র ভারতবাসী যে সংগ্রাম করেছিল একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য— তার সমাপ্তি ঘটেছিল ধর্মের নামে ভাগ হওয়া দুটো রাষ্ট্র সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। অর্থাৎ যে পা সামনে যাওয়ার কথা ছিল— সেই পা ভূতের পায়ের মতো পেছন দিকে চলে যায় ভারতবর্ষে বা ভারতীয় উপমহাদেশে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মীয় মোড়ক থেকে উপমহাদেশের একটি অংশকে বের করে এনে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির ঘোষণা দেন এ দিন।
বাঙালির সে ৭ মার্চ হারিয়ে গেছে। আজ যখন এই লেখা লিখছি, এ সময়ে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবেও একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র নয়। ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার পরবর্তী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি যে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র তৈরি করেছিল, স্বাধীনতার বিরুদ্ধ শক্তিরা যারা বাইরে ও এক পর্যায়ে স্বাধীনতার সংগ্রামের মধ্যে লুকিয়ে ছিল— তাদের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরে সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ ওই জাতিরাষ্ট্র আর নেই ।
এমনকি এ মুহূর্তে যে শক্তি বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার রাজ্য ও রাষ্ট্রীয় শক্তির চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানেও ৭ মার্চ নেই। ওই আধুনিক জাতিরাষ্ট্রও নেই।
এমনকি, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পরে দীর্ঘ সময়ে বঙ্গবন্ধুকে যেমন জাতির ইতিহাস থেকে আড়ালে ঠেলে দেবার চেষ্টা হয়েছিল আবারও সেই যুগে চলে গেছে বাংলাদেশ ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে।

৫ আগস্ট ২০২৪ এর মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনকারী মূল ব্যক্তি মুহাম্মদ ইউনূসের সব থেকে বড় সাফল্য— বাংলাদেশের সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের, তাই যারা যে ছদ্মাবরণেই থাকুক না কেন, তাদের এক করতে পেরেছে। এবং একটি তথাকথিত নির্বাচনের নামে বাংলাদেশকে তার শাসনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে বহুদেশ তার দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৌলবাদী, তথাকথিত ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে কখনও কখনও কোন নেতা বা সংগঠনের মাধ্যমে এক করছে। তারা দীর্ঘকাল রাজত্বও করেছে। যার ফলে ঢাকা পড়ে গেছে তার জাতির গৌরবময় অধ্যায়। আর ওই সময়ে তার দেশের প্রকৃত নেতাদের, আধুনিক নেতাদের চরিত্রহনন করা হয়, ইতিহাস থেকে তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশ এখন ঠিক তেমন একটি অধ্যায়ে রয়েছে। এ মুহূর্তে প্রকৃতভাবে ৭ মার্চ পালন করতে পারবে না দেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ি যা বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের একটি মাইলফলক, ইউনূসের আমলে তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখনও সে ভাঙা বাড়িটি “এ্যারেস্ট” করে রাখা হয়েছে।
তবুও গাঙ্গেয় বঙ্গের বাঙালি— নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে পরদিন সকাল থেকে আবার যে নতুন সংগ্রাম শুরু করে। যার কবি লেখে, জ্বলে পুড়ে মরে তবু মাথা নোয়াবার নয়। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে রবীন্দ্র-নজরুলের আদর্শে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির সংগ্রাম করেছিলেন সেই রবীন্দ্র-নজরুলের আদর্শের বাঙালি শেষ হয়ে যায়নি।
তাদের জন্যে আজ এক কঠিন উপলব্ধির দিন। আজ ৭ মার্চ পালন না করতে পারা, বঙ্গবন্ধুর সকল ভাস্কর্য ভাঙা, তাঁর নাম মুছে ফেলার এই চেষ্টা, যার মূল অর্থ বাঙালিকে তার আধুনিক রাষ্ট্র থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা। ছদ্মাবরণে থাকা ও প্রকাশ্যে থাকা সকল মৌলবাদীর একত্র হওয়ার একটি কঠিন সময়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরও একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়েছে “তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি” সৃষ্টির মাধ্যমে। অর্থাৎ ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পরের থেকে আরও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশের আধুনিক শক্তি।

তাছাড়া ১৯৭১ এর ৭ মার্চে পৃথিবীর দেশে দেশে ছিল আধুনিক শক্তির জাগরণ, এখন সারা পৃথিবীতে পশ্চাদপদদের একটি মহড়া চলছে। তবে আশার দিক হলো পৃথিবীর কিছু অংশ এই পশ্চাদপদতায় প্রবেশ করেছে তিন দশকেরও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চাদপদতা চরমেই চলে যাবে এখন। তার ভয়াবহতাই তার বিনাশের কারণ হবে।
তাই এবারের ৭ মার্চ মূলত ডাক দিয়ে যায় বাঙালিকে, আপন বুকের বজ্রানলে নিজেকে জ্বালিয়ে আরও আধুনিক পরিশুদ্ধ হবার। যার ফলে পৃথিবীর বর্তমানের অগ্রসর চিন্তার সঙ্গে মিলিয়ে তিরিশ থেকে ষাটের দশককে ভিত্তি ধরে আবার জেগে উঠতে পারে আধুনিক বাঙালি জনগোষ্ঠী— তার পশ্চাদপদ, অন্ধত্বে ভরা জনগোষ্ঠীকে পরিবর্তন ও পরাজিত করে।
লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 


















