২০২৫ সালের শেষে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। বৈদেশিক খাতে কষ্টার্জিত স্থিতি ফিরে আসায় স্বস্তি মিললেও দেশের ভেতরে আস্থা সংকট, দুর্বল বিনিয়োগ, খেলাপি ঋণের বিস্তার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধিকে চেপে ধরেছে। ফলে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত থাকলেও টেকসই পুনরুদ্ধার এখনও অধরা।
বৈদেশিক খাতে স্বস্তির নিশ্বাস
বিশ্লেষকদের মতে, সময়োচিত নীতিগত পদক্ষেপে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কমেছে এবং রিজার্ভ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আগের সরকারের সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার দর একশ বত্রিশে নেমে গেলেও এখন তা প্রায় একশ বাইশের কাছাকাছি স্থিত হয়েছে। অর্থপাচার রোধে নজরদারি জোরদার এবং অবৈধ হুন্ডি দমন জোরালো হওয়ায় প্রবাসী আয়ের বড় অংশ বৈধ পথে আসছে। সর্বশেষ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে সাতাশ শতাংশের বেশি এবং দুই হাজার পঁচিশ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই ধারা শক্তিশালী রয়েছে। এর ফলে নেট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সতেরো বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় আটাশ বিলিয়নে পৌঁছেছে, মোট রিজার্ভ ছাড়িয়েছে বত্রিশ বিলিয়ন ডলার। শক্তিশালী রিজার্ভ অবস্থান সরকারের বৈদেশিক দায় পরিশোধে সহায়তা করেছে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের অবস্থান কিছুটা উন্নত হয়েছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থার সংকট
বৈদেশিক খাতে অগ্রগতির বিপরীতে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। আগের সরকারের সময়কার সুশাসনের ঘাটতি স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলাপি ঋণ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। একসময় যা ছিল এক লাখ বিরাশি হাজার কোটি টাকা, মাত্র পনেরো মাসে তা বেড়ে ছয় লাখ চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আমানত কিছুটা বাড়লেও তারল্য সংকট কাটেনি। ফলে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সতর্ক ঋণনীতিতে যাচ্ছে, যার খেসারত দিচ্ছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাগুলোও। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা ও দেখার কৌশলে ঠেলে দিয়েছে। এর ফল হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে শূন্য দশমিক সাতের কাছাকাছি, যা কর্মসংস্থান ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা।
মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনের চাপ
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা চার বছর কড়াকড়ি মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। সুদের হার আট নয় শতাংশ থেকে বেড়ে বারো থেকে আঠারো শতাংশে পৌঁছেছে। সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি শিখর থেকে কিছুটা কমলেও তার সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি। মজুরি স্থবির, খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেশি থাকায় নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর সঞ্চয় ভেঙে পড়েছে, ঋণের ভার বেড়েছে।

রপ্তানি ও রাজস্বে সতর্ক সংকেত
রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি কমেছে প্রায় চৌদ্দ শতাংশ, যা সামনে রপ্তানি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। তবে শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানি কিছুটা বাড়ায় ভবিষ্যৎ সক্ষমতায় বিনিয়োগের ইঙ্গিত মিলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির আওতায় কর বৃদ্ধির চাপ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে এসেছে, আর রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারছে না।
আগামীর চ্যালেঞ্জ
নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ব্যাংকিং খাত সংস্কার বাস্তবায়ন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক স্থিতিশীলতার প্রকৃত সুফল মিলবে তখনই, যখন সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা দৃঢ়ভাবে ফিরে আসবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















