ক্লাবে আজকাল খুব বেশি সঙ্গী সাথীরা আসে না। সবাই যেন কেমন ঘরমুখো হয়ে পড়েছে। সবাই ক্লাবের বারে বসে নিঃশব্দেই যার যার মতো কয়েক পেগ খেয়ে চলে যায়।
সেদিন হঠাৎই এক অচেনা ব্যক্তিকে ঘিরে বেশ জমজমাট আড্ডা দেখে একটু বিস্মিত হয় আজম আহমদ। আবার মনে করে নতুন পরিবেশে, হয়তো ক্লাবের পরিবেশও বদলে গিয়েছে। তাই চেনা অচেনা সকলেই এখন ক্লাবে আসা শুরু করেছে। টেবিলের একটি চেয়ার যেমন ফাঁকা ছিলো তেমনি সেখানে আজম আহমদের অতি পরিচিত এক বন্ধু থাকায় তার ডাকে সেখানে গিয়ে বসতে হলো।
আজম আহমদের ইচ্ছে ছিল একটু নিরিবিলি কয়েক পেগ খেয়ে চলে আসা। আবার খুব যে সে ইচ্ছে ছিল তাও বলা যায় না। একান্ত একাকি পান করতে হলে তো নিজের বাসায় বসেই পান করতে পারতেন। তাছাড়া সে ছোট বেলায় বাল্য শিক্ষার বইয়ে পড়েছে, মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, সে সব সময় সঙ্গ চায়।
আজকাল অবশ্য মানুষ যে সমাজবদ্ধ জীব কিনা – তা নিয়ে আজম আহমদের অনেক প্রশ্ন। বরং জঙ্গলের পশুদের মতো তাহারও মানুষকে সমাজবদ্ধের বদলে দলবদ্ধ জীব বলে মনে হয়। সমাজের কাঠামো, বিশ্বাস, ভালবাসা, নৈতিকতা, প্রতিশ্রুতি এগুলো তার কাছে অনেক অতীতের ঘটনা মনে হয়।
কখনো কখনো তার মনে হয় হয়তো আধুনিক রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে ক্রমেই সমাজকে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে- রাষ্ট্র ক্ষমতার ও ব্যবসায়িক স্বার্থে। আবারও তার মনে হয় যখন আধুনিক রাষ্ট্র ছিলো না তখন তো ধৃতরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতা অন্ধ রাজা ছিলো। আবার মনসার মতো কুটিল সর্পদূতরা ছিলো- যারা চাঁদ-সওদাগারদের স্বাধীন বানিজ্য জাহাজকে ডুবিয়ে দিতো। বাধ্য করতো যেন সকল বানিজ্য মনসার মত মতই হয়। অর্থাৎ অন্ধ রাষ্ট্রক্ষমতা লোভ ও ভয়ংকর বানিজ্য সর্প “মনসা” সব সময়ই ছিলো। তাই তখন যে সমাজ খুব ভালো ছিলো এটাও ভাবতে পারে না আজম আহমদ।

তার মনে হয়, হয়তো আগের সমাজেও এমন কুটিলতা, স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা, এসবই ছিলো। আর তা না হলে মুনীরাও কেন কুমারী নারীকে ধর্ষণ করতেন। আর কুমারী নারীর গর্ভের সন্তানকে নানান পরিচয় নিয়ে বাঁচতে হতো।
তাই আজকাল আর সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে খুব বেশি উচ্চ ধারণা করতে পারে না আজম আহমদ। বরং ভাবে যদি তার বয়স আরেকটু কম হতো– তাহলে বৈশ্য স্বার্থ, ব্যক্তিস্বার্থ, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ- মানব সমাজকে কতটা স্বাভাবিকতার বাইরে নিয়ে গেছে এসব খুঁজে দেখার চেষ্টা করত। জীবনের এ প্রান্তে এসে এগুলো আর না ভাবাই ভালো।
তাই কোনো কিছু চিন্তা না করে সে নতুন আগুন্তুকের টেবিলের আড্ডায় শরিক হয়। কিন্তু যে আড্ডায় সে পরিচিত সে আড্ডার বদলে এখানে সে যা শুনছে তা অনেকটা গ্রামীণ জীবনের বিষয়। তাছাড়া নিতান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।
নতুন আগুন্তুক তাঁর দেশী নন, তবে তিনি এ দেশে নতুন বিয়ে করেছেন। বলা যেতে পারে এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। এবং তিনিই নিজমুখে তার সেই বউ এর প্রশংসা করছেন। তিনি বলেছেন, তার নতুন বউ খুবই বিনয়ী, খুবই সাদাসিদে, তার প্রতি খুবই অনুগত এবং যত্নশীল।
আর এগুলোর এক একটি করে উদাহরণ দিয়ে যাচ্ছেন। তার চারপাশের সকলে খুবই মনোযোগের সঙ্গে শুনছেন। এবং সেই সব গুনের গায়ে আরও রঙ লাগিয়ে যাচ্ছেন।
আজম আহমদের কাছে এ ধরনের কথা যে একেবারে অপিরিচিত আর এ মাপের মোসাহেবিও আজম আহমদের অপরিচিত নয়।
এ ধরনের পরিবেশে সবচেয়ে ভালো পথ হলো নীরবে পান করে চলা এবং একটু দ্রুত পান করা। যাতে সকলে মনে করে সে আজ অনেক বেশি পানীয় আসক্ত হয়ে পড়েছে। আজম আহমদও সেই কাজ করে চলেছেন। তবে কান দুটো তো আর বন্ধ রাখা যায় না। সবই তার কর্ণকূহরে প্রবেশ করছে।
রাত্রি ক্রমেই গাঢ় হতে চলেছে। অন্যদিকে আজম আহমদের পানীয়ের জোরে তার কাছে রাত ক্রমেই “তরুণী রাত্রি” হতে চলেছে।

আজম আহমদ আরও এক পেগ নিয়ে মুখে দিতে দিতে ভাবছিলেন, এভাবেই আজ রাতের পানীয় ও আড্ডা শেষ করে যেতে পারবে। শুধু শ্রোতা হিসেবে। একটি বাক্যও খরচ না করে। বাস্তবে একটি বাক্যও খরচ না করে একটি আড্ডায় পানীয় শেষে একটি হালকা মাথা নিয়ে রাতের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার একটা সুখই আলাদা।
আজম আহমদ যখন সেই সুখের চিন্তায় কেবলই ডুব দিতে যাবেন তখনই তার বন্ধু মিনার খান বললে, আজম তুমি কোনো কথা বলছো না কেন? তুমি তো কখনই এমন কথা না বলে থাকো না- বিষয়টি কী?
আজম মাথা নাড়িয়ে বুঝালো বিষয়টি কিছুই নয়। সে শুধু পানীয়তে প্রাণমন ঢেলে দিয়েছে।
আজমের পরিচিতরা কেউই তা মেনে নিতে রাজী নয়। সকলেই এককাট্টা হয়ে বলে, না, তোমার কথা আমরা বিশ্বাস করি না। একটি নারী, তার ওপরে ওনার এই বয়সের দ্বিতীয় বিয়ে, তার সম্পর্কে এত গুনাবলীর প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে- অথচ তুমি কিছুই বলছো না তা হতে পারে না।
আজম আহমদ বুঝলেন, তিনি বেকায়দায় পড়ছেন, এ ব্যুহ ভেদ করা কষ্ট হবে। তবুও আরও গভীর নীরবতায় নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি পানীয়কে “মাতা ত্রাতা” রূপে জ্ঞান করে রেহাই পাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সপ্তরথীই তাকে ঘিরে ফেললো।

এবার অনেকখানি তার প্রাণে বাঁচার পালার মতো অবস্থা হয়। তাই নিতান্ত বাঁচার তাগিদে তিনি সত্য তীরটি ছুঁড়লেন। অনেকটা আচমকা বজ্রপাতের মতো তার কন্ঠ, ওষ্ঠ, তালু, জিহবা মিলে যে বাক্যটি বেরিয়ে এলো তা ছিলো- সে তো আগে আমারই বউ ছিলো।
তখন সকলে তাকে যেন মৌমাছির মতো হুল ফুটিয়ে এবং কেউ কেউ স্বর উচ্চে তুলে বলতে শুরু করলেন, তাহলে তার প্রতি তোমার কোনো আগ্রহ নেই কেন? একজন বললো, সে কি তোমার প্রতি খুবই উগ্র ছিলো, অপরজন বলে, তার কি হাতটান অভ্যাস ছিলো, তোমার কোনো সম্পদ সে অন্য কোনো পথে সরাতো? সঙ্গে সঙ্গে আরেক জন বলে, সে কি তোমার জীবনের জন্য হুমকি ছিলো? কারো মুখ দিয়ে বের হয়, তার কি অন্য কোনো বা বহুজন- এমন কিছু-
বিষয়টি যখন এত নীচে নেমে যেতে চলেছে তখন আজম আহমদ নিস্তার খোঁজার চেষ্টায় অনেকটা শক্ত হয়ে উঠে- এবং সঙ্গে সঙ্গে অসহায়ও হয়ে পড়ে- কীভাবে বের হবে সে ওই আড্ডা থেকে।
ভাগ্য তার প্রতি সদয় হয়। সময় এসে তার পাশে দাঁড়ায়; সহসা বিদ্যুৎ চলে যায়। জেনারেটর কাজ করার আগের কয়েক মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে বেরিয়ে পড়েন আজম আহমদ।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 



















