জনজীবনের ৪২ বছরের মধ্যে প্রায় ৩২ বছরই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অজিত পওয়ার। বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি রেকর্ড ছয়বার মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে যে পদটি তিনি প্রকাশ্যেই সবচেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন—মুখ্যমন্ত্রীর আসন—তা জীবনের শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায়। ৬৬ বছর বয়সে বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর মাধ্যমে হঠাৎ করেই থেমে যায় এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়, যা ছিল টিকে থাকার লড়াই, বিতর্ক এবং ক্ষমতার শীর্ষে প্রাসঙ্গিক থাকার অবিরাম প্রচেষ্টায় ভরপুর। পওয়ার পরিবারে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আদর্শগত অবস্থান বদলে বিজেপির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির পথে হাঁটেন, এবং সেই প্রক্রিয়ায় নিজের কাকা শরদ পওয়ার গড়ে তোলা দল ভেঙে দেন।
বিজেপির সঙ্গে জোট—যার হিন্দুত্ববাদী অবস্থান ক্রমেই আরও কঠোর হচ্ছিল—সবসময় তার স্বভাবসিদ্ধ মনে হয়নি। কিন্তু তিনি ছিলেন রাজনৈতিক বাস্তববাদে বিশ্বাসী। ২০১৯ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভাঙা রায়ের পর দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের সঙ্গে তার মাত্র ৯০ ঘণ্টার জোট ভবিষ্যতের মহারাষ্ট্র রাজনীতির দিকনির্দেশই যেন আগাম জানিয়ে দিয়েছিল।
১৯৮২ সালে একটি চিনিকলের পরিচালনা পর্ষদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে অজিত পওয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ধীরে ধীরে কাকা শরদ পওয়ার তাকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। কাকার কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন মজবুত তৃণমূল সংযোগ গড়ে তোলা, অক্লান্ত পরিশ্রমের গুরুত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতা। তবে শরদ পওয়ারের মতো জাতীয় রাজনীতিতে তার কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। তার রাজনীতির জগৎ ছিল মহারাষ্ট্র, বিশেষত পশ্চিম মহারাষ্ট্র—যেখানে সমবায় রাজনীতির গর্ভেই তার রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছিল। চিনিকল, সমবায় ব্যাংক, সেচ বোর্ড এবং তৃণমূল প্রতিষ্ঠানই তার রাজনৈতিক চরিত্র গড়ে তোলে।

কর্মজীবনে তিনি একের পর এক ঝড় সামলেছেন, যার মধ্যে ২০১২ সালের ৭০ হাজার কোটি টাকার সেচ কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত অভিযোগ অন্যতম। তখন তিনি ছিলেন মহারাষ্ট্রের জলসম্পদমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রী। পরবর্তী সময়ে পুনের মুন্ধওয়ায় তার ছেলে পার্থের জমি লেনদেন ঘিরে ওঠা অভিযোগও তিনি সামাল দেন। ধারাবাহিক সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি নিজের দল ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হন, যা তাকে এক ‘রাজনৈতিক বেঁচে থাকা নেতা’র প্রতিচ্ছবি দেয়।
পশ্চিম মহারাষ্ট্রের দ্রুত নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির চরিত্র বদলাতে শুরু করলে, সেই পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রামীণ ভোটারের উদ্বেগ ও স্বপ্ন—দু’টিই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেন, নির্বাচন পরিচালনা করেন এবং প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিজেদের ঘাঁটিতেই পরাজিত করার ক্ষমতা দেখান। পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় ও বারামতি তার এই রাজনৈতিক কৌশলের স্পষ্ট উদাহরণ, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে কঠোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মিলিয়ে তিনি অঞ্চলগুলিকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেছিলেন যে প্রতিপক্ষরাও তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
তার এই ক্ষমতার মূল ছিল কঠোর পরিশ্রম, সময়নিষ্ঠতা—ভোর ৬টায় বৈঠক ডাকাও ছিল তার অভ্যাস—এবং প্রশাসনিক জটিলতা বোঝার গভীর দক্ষতা। বারামতি থেকে আটবার নির্বাচিত এই বিধায়ক ১৪ বছর মহারাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী ছিলেন এবং আগামী মাসে নিজের ১৪তম রাজ্য বাজেট পেশ করার কথা ছিল।
তবে তার উত্থানের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০০৪ সালেই। সে বছরের বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস কংগ্রেসের চেয়ে বেশি আসন পেলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ কংগ্রেসকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। অজিত পওয়ার পরে বলেছিলেন, সেই সময়েই তার উচিত ছিল কাকার পথ ছেড়ে আলাদা হওয়া। এই সিদ্ধান্তই তার রাজনৈতিক জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।

একবার তিনি বলেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হতে না পারার জন্য যেমন তার কাকা দায়ী, তেমনি রাজনীতিতে তিনি যা কিছু হয়েছেন তার পেছনেও কাকার অবদান রয়েছে। এই জটিল সম্পর্ক আরও টানাপোড়েনে পড়ে যখন স্পষ্ট হয় যে শরদ পওয়ার নিজের কন্যা সুপ্রিয়াকে উত্তরসূরি হিসেবে এগিয়ে রাখছেন।
২০১৯ সালে ভোররাতে দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের সঙ্গে গোপন শপথগ্রহণ ছিল কাকার বিরুদ্ধে তার প্রথম বিদ্রোহ, যা ব্যর্থ হয় এবং তাকে আরও একবার অন্য একজন—উদ্ধব ঠাকরের—মুখ্যমন্ত্রী হওয়া দেখতে হয়।
তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, যখন তিনি শেষ পর্যন্ত কাকার দল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তার নেতৃত্বের প্রমাণ মেলে তখনই, যখন এনসিপির ৫৪ জন বিধায়কের মধ্যে ৪৯ জন তার সঙ্গে বিজেপি-শিবসেনা জোট সরকারে যোগ দেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তার দল মাত্র একটি আসন পায় এবং বারামতিতে তার স্ত্রী সুনেত্রা পরাজিত হন। তবু কয়েক মাস পর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। বিজেপির সঙ্গে জোটে তার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ৪১টি আসন জেতে, যেখানে শরদ পওয়ার নেতৃত্বাধীন শিবির পায় মাত্র ১০টি আসন। এতে তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নিয়ে থাকা সন্দেহ অনেকটাই দূর হয়।
যোগেশ যোশি 


















