৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে কিছু তরুণ ও তাদের সহযাত্রী নানান বয়সের মানুষ মিলে কী করাচ্ছে তা প্রকাশের আসলে কোন উপমা এতদিন পাওয়া যাচ্ছিল না। ৫ আগস্টের পরে ডাকসু নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা এক তরুণ সর্বমিত্র চাকমা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে খেলতে আসা শিশু কিশোরদের কান ধরে ওঠ বস করালো তখন ওই শিশুদের জন্য দুঃখ হলেও একটি সত্য বোঝা গেল—বাস্তবে ৫ আগস্টের পর থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে শুধু নয় এ জাতির অনেক অর্জনকে কান ধরে ওঠ বস করানো হচ্ছে।
যেমন ৫ আগস্টের পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙা হয়েছে। বাঙালির স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে এবং ছোট করে মুক্তিযুদ্ধের নতুন ইতিহাসের বয়ান হয়েছে। এই বয়ান টিকে থাকবে কি টিকে থাকবে না তা বড় নয়। যারা করেছেন তারা ভালো করেছেন কি খারাপ করেছেন তা বড় নয়—সত্য হলো জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জনের ইতিহাসকে কান ধরে ওঠ বস করানো হয়েছে।
৫ আগস্টের পরে ফ্যাসিস্ট তকমা দিয়ে সাকিব আল হাসানকে ক্রিকেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ একজন ব্রাডম্যান, ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, শচীন টেন্ডুলকর, সাকিব আল হাসান শত বছরেও একটি জাতির ক্রিকেটে একজনের বেশি জন্মায় না। তাই সাকিব আল হাসানকে যখন খেলতে দেওয়া হয় না তখন মূলত দেশের ক্রিকেটের ইতিহাস, অর্জন ও গর্বকে কান ধরে ওঠ বস করানো হয়।

ভেঙে ফেলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু, লালন, মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য, কালি মাখানো হয়েছে নারী শিক্ষার অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াতের ভাস্কর্যে। কটুক্তি করা হয়েছে রোকেয়াকে নিয়ে। এমনকি ভেঙে ফেলা হয়েছে টেরা কোটা অবধি। অর্থাৎ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সর্বমিত্র যা করেছে সেই কাজ তার অন্য সহযোগীরাও করেছে।
দেশের বড় বড় সম্পাদকদের কেউ যখন বলেন, মত প্রকাশ এখন বহুদূরে চলে গেছে, এখন বেঁচে থাকাটাই বড়। কোন সম্পাদককে বলতে হয়, অমুক রাজনীতিবিদ আরও আগে দেশে ফিরলে ভালো হতো। শুধু মিডিয়া হাউজকে বাঁচানোর জন্য যখন নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে এও বলতে হয়—ওই দলটির আমলে তুলনামূলক মিডিয়ার স্বাধীনতা ছিল। অথচ ওই দলটির আমলে তোয়াব খানের মতো প্রবীণ সম্পাদক গ্রেপ্তার করা হয়েছে, লেখক, ইতিহাসবিদ গ্রেপ্তার হয়েছে, প্রেসক্লাবে পুলিশ ঢুকে আহত করেছে শত শত সাংবাদিককে। এসব জানার পরেও কোন সম্পাদককে একথা যখন বলতে হয় তখন বোঝা যায় তার সামনে বা পেছনে একজন সর্বমিত্র দাঁড়িয়ে আছে। আর তিনি সর্বমিত্রের কথামতো কাজ করছেন।
দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের কর্মরত বিচারপতি, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, সচিব, পুলিশ প্রধান, সামরিক কর্মকর্তা, প্রবীণ অধ্যাপক, প্রবীণ লেখক, সাংবাদিক—এরা শুধু ওই পদে চাকরি করেছিলেন বা চাকরিরত ছিলেন তা নয়, এরা সকলেই এক একটি প্রতিষ্ঠান। তাদেরকে যখন অজ্ঞাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়, বা চাকরিচ্যুত করা হয় তখন এটাই স্পষ্ট হয় শুধু তাদেরকে নয়, তাদেরকে প্রতীক ধরে সর্বমিত্ররা গোটা দেশের প্রতিষ্ঠানকে কান ধরে ওঠ বস করাচ্ছে।

এমনকি যারা এই সর্বমিত্রদের এই কাজের সুযোগ দিচ্ছেন তারাও বাদ যান না। তারা অনেক কিছুই সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। এখন বারো তারিখ যদি নির্বাচন হয়ে যায়—তাহলে শুধুমাত্র নিজেদের চেহারায় একটা ঔজ্জ্বল্য (এটা কোন কারণে হয় তা সকলে জানে) ছাড়া আর কোন কিছু সংস্কার ছাড়াই হয়তো শেষ হবে। হয়তো নাও হতে পারে। তবে তারাও যে সর্বমিত্রের হাত থেকে বাদ গেছেন তা নয়। তারা নারীদের সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। সেখানেও সর্বমিত্ররা হুমকি দিতেই তারা সর্বমিত্রের নির্দেশমতো আপ-ডাউন করে মাঠ ছেড়ে দিলেন।
শুধু এখানেই শেষ নয়। সর্বমিত্রদের কারণে আজ বাংলাদেশের পাসপোর্ট সারা পৃথিবীর সামনে কান ধরে ওঠ বস করছে। বাংলাদেশের রপ্তানি ওঠ বস করছে। আমদানি ওঠ বস করছে। নিজ আয়ের কষ্টের টাকা ব্যাংকে রেখে তা তোলার জন্য গ্রাহকরা এক বছর ধরে কান ধরে ওঠ বস করছে।
সর্বোপরি, নিম্নআয়ের মানুষ, এমনকি মধ্যবিত্ত বাজার করতে গিয়ে, ওষুধ কিনতে গিয়ে, চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিজেই নিজের কান ধরে ওঠ বস করছে। আর বলছে, আমরা ভুল করেছি। আগে ভালোই ছিলাম, দাঁড়িয়ে ছিলাম, নিজের ইচ্ছেমতো হাঁটতাম, খেতাম, খেলতাম, ঘুমাতাম। আর এখন কেবল সর্বমিত্রদের কথামতো সব কিছুতেই কান ধরে ওঠ বস করতে হচ্ছে।


লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 























