ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর জনপ্রিয় নয়।
প্রায় ৮০ বছর আগে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বের বড় একটি অংশ এতে যুক্ত হয়েছিল। নিউইয়র্ক সিটিতে ১৯৪৭ সালের কাছাকাছি সময়ে জাতিসংঘের একটি সভাকক্ষের দৃশ্য সেই শুরুর স্মৃতি বহন করে। শান্তি কখনো হঠাৎ করে আসে না; একে অত্যন্ত সতর্কতা ও সচেতন পরিকল্পনার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হয়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন, যাকে তিনি বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানের নতুন মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরছেন, তার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দিক এক বিলিয়ন ডলারের স্থায়ী সদস্য ফি বা এল সালভাদর, বেলারুশ কিংবা সৌদি আরবের মতো বিচিত্র দেশের তালিকা নয়। বরং আসল বিষয় হলো, এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র—যে দেশ জাতিসংঘের প্রধান স্থপতি—খোলাখুলিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, তিনি জাতিসংঘের সম্ভাবনায় বিশ্বাসী, কিন্তু তার মতে সংস্থাটি কখনোই সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের মধ্যে হঠাৎ বিচ্ছেদ হিসেবে না দেখে বরং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো হিসেবে বোঝাই ভালো। এটি সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সাম্প্রতিক অধ্যায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেরই গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছে। এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ কীভাবে একসময় নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছিল, সেই স্মৃতির বৈশ্বিক বিস্মৃতি—অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘ সময়জুড়ে জাতিসংঘ বহু সংকটকে বড় যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করেছে। দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি ব্যর্থ হলে সংস্থাটি একটি প্রতিরোধক প্রাচীরের মতো কাজ করত। কিন্তু সেই ইতিহাস যতই ঝাপসা হয়েছে, ততই বিশ্বের রাজনৈতিক নেতারা জাতিসংঘকে অর্থহীন কথাবার্তার পুরোনো মঞ্চ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। এই স্মৃতিভ্রংশ পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকদের দৃষ্টিসীমা সংকুচিত করেছে। তারা এখন এমন কোনো নিরাপত্তা কাঠামো কল্পনা করতে পারছেন না, যা প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের শূন্য-সমষ্টির খেলায় আবদ্ধ নয়। আমরা যদি বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের সেই অভিজ্ঞতা ভুলে যাই—যখন জাতিসংঘ সংঘাত বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল—তাহলে ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকাতে যে ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার, তা কল্পনাও করতে পারব না।
প্রায় ৮০ বছর আগে জাতিসংঘ গড়ে তুলেছিলেন এমন মানুষরা, যারা দুই বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিজের চোখে দেখেছেন। এটি কোনো কল্পলোকের প্রকল্প ছিল না; বরং পারমাণবিক যুগের ধ্বংসাত্মক সম্ভাবনায় আতঙ্কিত বাস্তববাদী ও যুদ্ধক্লান্ত প্রতিষ্ঠাতাদের একটি ব্যবহারিক উদ্যোগ। তাদের বিশ্বাস ছিল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হাতিয়ার হিসেবে যুদ্ধকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এসেছে। তারা এমন এক রাজনৈতিক কাঠামো গড়তে চেয়েছিলেন, যা শক্তি প্রয়োগে শৃঙ্খলা আরোপ করবে, বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
বিশ্বের বড় অংশ এতে সাড়া দিয়েছিল। প্রথম কয়েক দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার বহু নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র—যারা দীর্ঘ উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল—জাতিসংঘে যোগ দেয়। এর ফলে সংস্থাটি মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম প্রায় সর্বজনীন প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। যদিও নিরাপত্তা পরিষদে চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো ক্ষমতার কারণে শীতল যুদ্ধের রাজনীতিতে প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি হতো, তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাতিসংঘকে নতুন প্রাণ দেয়। এই সময়েই মহাসচিবরা বিশ্ব রাজনীতির প্রধান শান্তিসাধকে পরিণত হন।

এক সময় তারা ছিল অত্যন্ত কার্যকর। ১৯৫৬ সালে মহাসচিব ড্যাগ হামারশোল্ড জাতিসংঘের প্রথম শান্তিরক্ষা অভিযান মোতায়েন করে সুয়েজ সংকটকে বৃহৎ শক্তির যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করেন। ১৯৬২ সালে তাঁর উত্তরসূরি উ থ্যান্ট—যিনি আমার দাদা—কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট প্রশমনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেন। জন এফ কেনেডি, নিকিতা খ্রুশ্চেভ ও ফিদেল কাস্ত্রোর মধ্যে মধ্যস্থতা করে তিনি উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করেছিলেন, যদিও ইতিহাসের এই অধ্যায় প্রায় সম্পূর্ণভাবে জনপ্রিয় স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। এক বছর পর কঙ্গোতে, উ থ্যান্টের কর্তৃত্বে ভারতীয় নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ বাহিনী বেলজিয়াম-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সেনাদের পরাজিত করে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে। পরবর্তী বছরগুলোতে উ থ্যান্ট ও তাঁর উপ-মহাসচিব রালফ বানচে সাইপ্রাস থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত অন্তত ছয়টি সংঘাতের অবসান বা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এই পুরো সময়জুড়ে মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের মধ্যে জাতিসংঘের প্রতি ব্যাপক সমর্থন ছিল। ওয়াশিংটন এমন একটি সংস্থার সঙ্গে স্বচ্ছন্দ ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য জোরদারে বাধা দেয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে জাতিসংঘ ওয়াশিংটনে অপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে—কারণ এটি অকার্যকর ছিল বলে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত মূল স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছিল বলে। প্রথম বড় বিচ্ছেদ ঘটে ষাটের দশকের মাঝামাঝি ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে। উ থ্যান্ট প্রকাশ্যে যুদ্ধের সমালোচনা করেন, এর কৌশলগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান। এতে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ও কংগ্রেসের যুদ্ধপন্থীদের ক্ষোভ চরমে ওঠে। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ আরেকটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যুদ্ধের পর দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের পূর্ণ প্রত্যাহারসহ মধ্যপ্রাচ্যে সমঝোতার পক্ষে জাতিসংঘের অবস্থান অনেক আমেরিকানের মনে ধারণা জন্মায় যে সংস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইহুদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট।
সত্তরের দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলো জাতিসংঘের ভেতরে পণ্য চুক্তি, প্রযুক্তি বিনিময় ও উন্নয়ন অর্থায়নের মাধ্যমে আরও ন্যায্য বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ার চেষ্টা করলে, তা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক মুক্তবাজার বিশ্বায়নের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সময়ে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে জাতিসংঘ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ যখন কঠোর নিষেধাজ্ঞার দাবি তোলে, যুক্তরাষ্ট্র তখন তুলনামূলক নমনীয় নীতির পক্ষে ছিল। আশির দশকে ওয়াশিংটনের মনোযোগ আরও সরে গেলেও মহাসচিব হাভিয়ের পেরেস দে কুয়েলার ও তাঁর অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারী দল নীরবে মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কম্বোডিয়ায় শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করেন। এর ফলে এসব অঞ্চলের প্রক্সি যুদ্ধগুলো পরাশক্তির সম্পর্ককে আরও বিষিয়ে তুলতে পারেনি এবং শীতল যুদ্ধের অবসানের পথ তৈরি হয়।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের যুগ শুরু হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন তথাকথিত উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এই বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘকেন্দ্রিক আগের আন্তর্জাতিকতাবাদী ব্যবস্থার অর্জনগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে চলে যায়। জাতিসংঘকে তখন ক্রমশ দূরবর্তী গৃহযুদ্ধ ব্যবস্থাপনার এক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রে রূপান্তর করা হয়—মানবিক সহায়তা ও শান্তিরক্ষা অভিযানের মাধ্যমে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার আগের ভূমিকা আড়ালে চলে যায়। ফলে সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত চিন্তায় প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
আজ আবার যুদ্ধ ও অস্থিরতা বাড়ছে, বাড়ছে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকিও। ১৯৪৫ সালের পর বহুবার আমরা তীব্র সংঘাত ও পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখেছি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম এমন এক সময়ে আমরা এসব সংকটের মুখোমুখি, যখন জাতিসংঘের সেই নীতি, প্রতিষ্ঠান ও চর্চাগুলো—যেগুলো অসম্পূর্ণ হলেও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করত ও আলোচনার পথ দেখাত—প্রায় সম্পূর্ণভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে কেবল একটি মৌলিকভাবে পুনর্গঠিত জাতিসংঘে নতুন করে বিনিয়োগ, ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’ নয়, তার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















