চীনের একাধিক শহরে এখন এমন সব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও কেবল কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল। আকাশে উড়ন্ত গাড়ি, নিজের মতো চলা ট্যাক্সি, রোবটের হাতে ব্যাটারি বদলানো গাড়ি, আবার পার্কে বসে আকাশ থেকে নামা দুপুরের খাবার—সব মিলিয়ে এখানে ভবিষ্যৎ যেন বর্তমানেই হাজির। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পরিষ্কার জ্বালানি ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিকে ঘিরে চীনের রাষ্ট্রীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
ভবিষ্যতের শহর হিসেবে হেফেই
চীনের হেফেই শহর এখন পরীক্ষাগার। এখানে বাস্তব সময়ে পরীক্ষা হচ্ছে নতুন পরিবহন ও শক্তি প্রযুক্তি। শহরের এক প্রান্তে দেখা যায় দূরনিয়ন্ত্রিত উড়ন্ত যান, যা ট্যাক্সির মতো নির্দিষ্ট স্টেশনের মধ্যে যাত্রী আনা নেওয়ার পরিকল্পনায় রয়েছে। অন্য প্রান্তে দেখা যায় পার্কিং এলাকায় রোবট, যা কয়েক মিনিটেই বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি বদলে দিচ্ছে। সবকিছু সব সময় নিখুঁত না হলেও, এই শহরেই ধরা পড়ছে আগামী দিনের চীনের ছবি।
আকাশে উড়ন্ত যান, মাটিতে নতুন বাস্তবতা
হেফেইতে পরীক্ষামূলক উড়ন্ত যান চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দুই আসনের এই যানে চালক নেই, দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। একবার চার্জে নির্দিষ্ট সময় উড়তে পারে এবং গতিও তুলনামূলক বেশি। যাত্রীরা জানান, পুরো অভিজ্ঞতায় হালকা কাঁপুনি থাকলেও ভয় ধরানোর মতো কিছু নেই। যদিও সব মানুষের জন্য এই যান এখনও ব্যবহারযোগ্য নয়, তবু এটি দেখিয়ে দিচ্ছে চীনের পরিবহন ভাবনায় কতটা সাহসী পরিবর্তন আসছে।

ব্যাটারি বদলানো রোবটের শহর
চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ি এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। নতুন গাড়ির বিক্রিতে এগুলো বড় অংশ দখল করে ফেলেছে। হেফেইয়ের রাস্তায় দেখা যায় বিশাল চার্জিং স্টেশন এবং ড্রাইভ-থ্রু ব্যাটারি বদলানোর কেন্দ্র। গাড়ি একটি ঘনক আকৃতির গ্যারেজে ঢুকলে নিচ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরোনো ব্যাটারি বের করে নতুন ব্যাটারি বসিয়ে দেয় রোবট। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট, যা প্রচলিত জ্বালানি নেওয়ার সময়ের কাছাকাছি।
আকাশ থেকে নামা দুপুরের খাবার
শহরের পার্কে বসে খাবার অর্ডার করলে তা আকাশপথে এসে পৌঁছায়। খাবার প্রস্তুত হওয়ার পর ড্রোনে তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠানো হয়। কোথাও কোথাও এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে, যেমন বেশি মোড়ক ব্যবহার বা অপেক্ষার সময়। তবু জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী পরিবহনে এই ড্রোন ব্যবস্থাই ইতিমধ্যে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। হাসপাতালগুলো দ্রুত রক্ত ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
দ্রুতগতির রেল, সময়কে ছোট করে আনা
চীনের দ্রুতগতির রেল ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কয়েক দশকের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বিশাল নেটওয়ার্ক শহর থেকে শহরে যাতায়াতকে সহজ করেছে। ঘণ্টায় কয়েকশ কিলোমিটার গতিতে চলা এই ট্রেনে বসে জানালার বাইরে তাকালে মনে হয়, পাশের সড়কের গাড়িগুলো যেন স্থির। যদিও নির্মাণে বিপুল খরচ ও ঋণের বোঝা রয়েছে, তবু পরিবেশ দূষণ কমানো ও সময় সাশ্রয়ের দিক থেকে এই রেলব্যবস্থা চীনের বড় সাফল্য।

চালকহীন ট্যাক্সির অভিজ্ঞতা
উহানে পৌঁছালে দেখা মেলে চালকহীন ট্যাক্সির। মোবাইলের মাধ্যমে ডাকা এই গাড়িতে কোনো মানুষ চালক নেই। দরজা খোলার পর শোনা যায় কৃত্রিম কণ্ঠের নির্দেশনা। স্টিয়ারিং নিজে নিজেই ঘোরে, গাড়ি চলে নির্ধারিত পথে। যদিও মাঝে মাঝে গন্তব্য পরিবর্তনের মতো সমস্যায় পড়তে হয়, তবু আগের তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেকটাই মসৃণ হয়েছে।
রোবট ট্রাক আর বদলে যাওয়া সরবরাহ ব্যবস্থা
চীনের শহর ও গ্রামাঞ্চলে এখন রোবট ট্রাক দেখা যাচ্ছে। এসব ট্রাকে চালকের আসন নেই, দেখতে ধাতব বাক্সের মতো। গুদাম থেকে পণ্য তুলে এনে নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেয় এই ট্রাক, পরে ছোট বৈদ্যুতিক যান বা মানুষের মাধ্যমে পণ্য বিতরণ হয়। এমনকি গ্রামাঞ্চলের সড়কে এই ট্রাককে গবাদিপশুর পথ ছাড়ার অপেক্ষা করতেও দেখা গেছে।

শহরের নিচে নতুন জীবন
চীনের শহরগুলোতে দ্রুতগতিতে তৈরি হচ্ছে নতুন পাতালরেল। অনেক ক্ষেত্রেই স্টেশনগুলো আগেভাগে তৈরি করে মাটির নিচে বসানো হচ্ছে। নতুন লাইনগুলোতে ট্রেন চলে চালক ছাড়াই। ব্যস্ত সময়ে কয়েক মিনিট পরপর ট্রেন আসে, ফলে সড়কের যানজট ও বায়ুদূষণ কমছে। আধুনিক নকশার এসব স্টেশন শহুরে জীবনে নতুন গতি এনে দিচ্ছে।
ঝুঁকি নেওয়ার সাহসই বড় বার্তা
সব প্রযুক্তি যে সফল হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কিছু ধারণা হয়তো চীনের বাইরে কাজে লাগবে না। তবু পরীক্ষার এই সাহসই চীনের বড় শক্তি। যেখানে অন্য দেশ দুর্ঘটনা বা বিতর্কে থেমে যায়, সেখানে চীন এগিয়ে যায় বাস্তব প্রয়োগে। এই পরীক্ষাগুলোই ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে ভবিষ্যৎ আর দূরের কল্পনা নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 








