গত কয়েক দিনে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অনুষ্ঠিত শুনানিগুলো একটি প্রক্রিয়াগত এখতিয়ার বা প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্কের চেয়েও অনেক গভীর সত্য প্রকাশ করেছে। এসব শুনানি মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের একটি সুপরিকল্পিত ও সুসংহত আইনি কৌশল উন্মোচন করেছে—আদালতকক্ষ থেকেই রোহিঙ্গাদের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে পদ্ধতিগতভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা।
গণহত্যা সনদের আওতায় আনা অভিযোগগুলোর মূল বিষয়ে মুখোমুখি হওয়ার বদলে জান্তার আইনজীবীরা প্রায় পুরোপুরি বিমূর্ততায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের উপস্থাপনা দখল করে রেখেছিল মামলা করার অধিকার, গ্রহণযোগ্যতা, সময়সীমা এবং মিয়ানমারের পক্ষে কথা বলার ক্ষমতা কার—এই ধরনের প্রশ্ন। কী বলা হয়েছে তার চেয়েও বেশি লক্ষণীয় ছিল কী বারবার এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নাম প্রায় উল্লেখই করা হয়নি।
যাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের কারণেই এই মামলা, সেই জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস ও চলমান ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো অনুপস্থিত। এটি কোনো অসাবধানতা ছিল না; এটি ছিল একটি কৌশল।

আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার সূচনা হয় একটি সুরক্ষিত গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে। এই অপরাধ কেবল গণহত্যা বা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীকে ‘জনগোষ্ঠী হিসেবে’ ধ্বংস করার বিষয়। মিয়ানমারে এই প্রক্রিয়া দশকের পর দশক ধরে চলেছে—নাগরিকত্ব অস্বীকার, চলাচলে বিধিনিষেধ, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিতকরণ এবং রোহিঙ্গা পরিচয়কে পদ্ধতিগতভাবে অবৈধ প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে। ২০১৬–২০১৭ সালে সেনাবাহিনী তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করার অনেক আগেই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রের ভেতর আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য করে ফেলা হয়েছিল।
বিশ্ব আদালতে সাম্প্রতিক শুনানিগুলো দেখিয়েছে, মুছে ফেলার এই যুক্তি এখন যুদ্ধক্ষেত্র ও আমলাতন্ত্র থেকে আদালতকক্ষেও চলে এসেছে। জান্তার আইনি কৌশল মামলার মানবিক কেন্দ্রবিন্দু কেড়ে নিয়ে এটিকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার একটি কারিগরি বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। এর মাধ্যমে আদালতের সামনে থাকা মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া হয়—নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে তারা যা, সেই পরিচয়ের কারণেই কি ধ্বংসের লক্ষ্য করা হয়েছিল।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণহত্যা আইন বিমূর্ততায় কাজ করে না। হলোকাস্টের ছায়ায় গণহত্যা সনদ প্রণয়ন করা হয়েছিল ঠিক এই জন্যই, যাতে আইনি আনুষ্ঠানিকতা অপরাধীদের আড়াল করতে না পারে। এই আইন আদালতকে ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করতে, সুরক্ষিত গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করতে এবং উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে বাধ্য করে। যখন কোনো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র মামলার কেন্দ্রে থাকা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করতেও অস্বীকার করে, তখন সেটি সৎ বিশ্বাসে আত্মপক্ষ সমর্থন নয়; বরং আইনকেই ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেওয়ার চেষ্টা।

এখানে ঝুঁকি হলো—প্রক্রিয়াগত আনুষ্ঠানিকতা যেন সহযোগিতায় পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক আদালতগুলো নকশাগতভাবেই সতর্ক প্রতিষ্ঠান। তারা এখতিয়ারের স্পষ্টতা, প্রক্রিয়াগত ন্যায় এবং রাষ্ট্রের সম্মতিকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু যখন এই প্রবণতাগুলো বিষয়বস্তুর মূল্যায়নকে ছাপিয়ে যায়, তখন আইনি প্রক্রিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারা শাসকগোষ্ঠীর হাতে তা শোষণের সুযোগ তৈরি করে। দ্য হেগে জান্তার কৌশলটি অন্যান্য নৃশংসতা–সংক্রান্ত মামলায় দেখা একটি বৃহত্তর ধারার প্রতিফলন—যথেষ্ট সময় ধরে ন্যায়বিচার বিলম্বিত করা, প্রক্রিয়ার ভারে তথ্য চাপা দেওয়া, আর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক তাগিদকে নিস্তেজ করে ফেলা।
রোহিঙ্গাদের জন্য সময় নিরপেক্ষ নয়। প্রায় ১০ লাখ মানুষ এখনো বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে—নতুন করে সহিংসতা, মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার সীমিতকরণ এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্যসংকট। আইনি বিলম্বের প্রতিটি বছর বাস্তুচ্যুতি স্থায়ী করে এবং এমন এক বাস্তবতাকে স্বাভাবিক করে তোলে, যেখানে প্রত্যাবর্তন, নাগরিকত্ব ও ন্যায়বিচার আরও দূরের বিষয় হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যদি মামলাটিকে কেবল প্রতিনিধিত্ব ও মামলা করার অধিকার–সংক্রান্ত প্রশ্নে সীমাবদ্ধ হতে দেয় এবং অন্তর্নিহিত অপরাধগুলোর বিষয়ে জোরালো সম্পৃক্ততা দাবি না করে, তবে তা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করার ঝুঁকি নেবে।

লেখক: ড. আজিম ইব্রাহিম ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক নিউলাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসিতে বিশেষ উদ্যোগবিষয়ক পরিচালক।
ড. আজিম ইব্রাহিম 



















