ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাজার হিসেবে পরিচিত ভারত এভাবে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কে যুক্ত হলো।
ভারতের প্রস্তাবের পেছনের যুক্তি
ভারতীয় আইনপ্রণেতা এল. এস. কে. দেবরায়ালু বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতের শিশুরা ক্রমেই আসক্ত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ভারত বিদেশি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্য সরবরাহ করছে, যা তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, এর ফলে ভারতীয় ব্যবহারকারীরা কার্যত বিনা পারিশ্রমিকে তথ্য সরবরাহকারী হয়ে উঠছেন, আর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা ভোগ করছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিশ্বজুড়ে কিশোরদের জন্য নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রথম দেশ হিসেবে নজির গড়েছে। এ সিদ্ধান্তকে অনেক অভিভাবক ও শিশু অধিকারকর্মী স্বাগত জানালেও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো সমালোচনা করেছে। একই পথে হাঁটার উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স, যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য নিষেধাজ্ঞা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ব্রিটেন, ডেনমার্ক ও গ্রিসও বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া
ভারতের প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে একটি বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্থা জানিয়েছিল, তারা অভিভাবকদের তদারকির পক্ষে আইন সমর্থন করে, তবে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিলে কিশোররা আরও অনিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণহীন প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করে।
ভারতের বর্তমান বাস্তবতা
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার হিসেবে ভারতে প্রায় ৭৫ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার হচ্ছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশে কোনো ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারিত নেই। ফলে কিশোর ও শিশুরা অবাধে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।

প্রস্তাবিত আইনের মূল দিক
দেবরায়ালুর ১৫ পৃষ্ঠার খসড়া বিলে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে, রাখতে বা ব্যবহার করতে পারবে না। যদি কারও এমন অ্যাকাউন্ট পাওয়া যায়, তাহলে তা বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ব্যবহারকারীর বয়স যাচাইয়ের পুরো দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপরই থাকতে হবে।
সরকারি পর্যায়ে আলোচনা
সম্প্রতি ভারতের সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ডিজিটাল আসক্তি মোকাবিলায় বয়সভিত্তিক প্রবেশাধিকার নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইন পাসের সম্ভাবনা
এই বিলটি ব্যক্তিগত সদস্যদের উদ্যোগে উত্থাপিত হওয়ায় এটি সরাসরি সরকারের প্রস্তাব নয়। তবে ভারতের সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এ ধরনের বিল প্রায়ই আলোচনার সূত্রপাত করে এবং ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলতে পারে। দেবরায়ালু দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের ক্ষমতাসীন তেলুগু দেশম পার্টির সদস্য, যা মোদির জোট সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















