ভারতের অর্থনীতি ও রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল খাত কৃষি। দীর্ঘদিন ধরেই এই খাত আধুনিকায়নের দাবি উঠছে। কিন্তু প্রতিবারই সংস্কারের পথে গিয়ে রাজনৈতিক বাধা, কৃষক আন্দোলন ও ভোটের সমীকরণে পিছু হটতে হয়েছে সরকারকে। এবার তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে আবারও প্রশ্ন—কৃষিই কি হবে সরকারের পরবর্তী বড় সংস্কার লক্ষ্য।
অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা
নরেন্দ্র মোদির প্রথম মেয়াদের শুরুতে ভূমি অধিগ্রহণ আইনে পরিবর্তনের চেষ্টা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তখন সরকারকে বড় শিল্পের পক্ষপাতী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে কৃষিপণ্যের বাজার সংস্কারের উদ্যোগ দেশজুড়ে দীর্ঘ আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের একাংশ কৃষক সেই সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত সরকার আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। শ্রম আইনসহ একাধিক জটিল সংস্কার ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। আগামী বাজেটে بيرোক্রেসির জট কমানোর ইঙ্গিতও মিলেছে। তবু সামনে প্রাদেশিক নির্বাচন থাকায় কৃষি নিয়ে নতুন করে বড় সিদ্ধান্ত নিতে সরকার সতর্ক। এরই মধ্যে কৃষক সংগঠনগুলো দেশজুড়ে আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছে।

উৎপাদনশীলতার সংকট
কৃষিতে উৎপাদন বাড়লেও তা এখনও প্রত্যাশার তুলনায় কম। গত ছয় দশকে ফলন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু চীনের তুলনায় ভারতীয় ধান চাষিরা এখনও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম উৎপাদন করেন। ডাল উৎপাদনে সংকটগ্রস্ত দেশগুলোর কাছেও ভারত পিছিয়ে। এই কম উৎপাদনশীলতা শুধু কৃষকের আয় নয়, নগরায়নকে ও ধীর করে দিচ্ছে। গ্রামে দারিদ্র্য থাকলে মানুষ শহরে গিয়ে নতুন কাজের সুযোগ নিতে পারে না।
ভর্তুকি ও নিয়ন্ত্রণের জট
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার বড় কারণ ভর্তুকি ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের জটিল কাঠামো। সস্তা বিদ্যুৎ, সার এবং নির্দিষ্ট ফসলের জন্য সরকারি মূল্য নিশ্চয়তা কৃষকদের সিদ্ধান্তকে বিকৃত করছে। ভোক্তা মূল্য বাড়লেই সরকার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। দুই হাজার বাইশ সাল থেকে গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তার উদাহরণ। এক অর্থনীতিবিদের ভাষায়, এটি যেন একসঙ্গে গাড়ির গতি বাড়ানো ও ব্রেক চেপে ধরার মতো।
গ্রামে বদলানো হাওয়া
পরপর ভালো বর্ষার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। অন্যান্য খাতের তুলনায় কৃষি শ্রমিকদের আয় দ্রুত বাড়ছে। একাধিক বাজারে কৃষকদের মুখে তেমন অসন্তোষ নেই। তাদের প্রধান অভিযোগ অবকাঠামো, বিশেষ করে সেচ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের ঘাটতি।
গ্রামগুলোতে সরকারি সহায়তা ও বেড়েছে। খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ও আবাসন প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন বহু মানুষ। ফলে বড় ধরনের কৃষক আন্দোলনের জমি আগের মতো উর্বর নয় বলেই অনেকের ধারণা।
বাজারের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ পথ
দুই হাজার কুড়ি সালের প্রস্তাবের মূল কথা ছিল কৃষকদের নিজেদের পণ্য বিক্রির স্বাধীনতা দেওয়া। সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও বাস্তবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটছে। চুক্তিভিত্তিক চাষসহ নানা পথে কৃষকেরা সরকারি বাজারের বাইরে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। এতে ঐতিহ্যবাহী মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমছে। অনেকেই বলছেন, এই পেশার ভবিষ্যৎ আর আগের মতো নয়।
কিছু রাজ্যে কৃষকদের উচ্চমূল্যের ফসলে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচিতেও সংস্কারের কথা বলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সত্যিকারের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে কৃষিতে এক ধরনের বড় মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত দরকার, যেমনটি একসময় শিল্প ও অর্থনীতিতে নেওয়া হয়েছিল।
যদি সরকার সেই পথে এগোয়, তবে লাভবান হবেন কৃষকরাই। প্রশ্ন শুধু একটাই—রাজনৈতিক সাহস কি এবার সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















