বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের বাজারে দরপতনের ধারা যেন অনিবার্য হয়ে উঠছে। সরবরাহের লাগামছাড়া বৃদ্ধি আর ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির দুর্বল প্রভাব মিলিয়ে চলতি বছর তেলের দাম পঞ্চাশ ডলারের ঘরে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা অভিযানের পরও বাজারে বড় কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকায় এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট
বিশ্বের বড় আর্থিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার বাজার বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে একই সুর। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত সরবরাহের চাপে ব্রেন্ট তেল মধ্য বছরের মধ্যেই পঞ্চাশ ডলারের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে এবং সেখান থেকে টেকসই ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

সরবরাহ বাড়াচ্ছে উৎপাদক জোট
দীর্ঘদিন উৎপাদন সীমিত রেখে দাম ধরে রাখার কৌশল নেওয়া উৎপাদক দেশগুলোর জোট এখন ধীরে ধীরে কল খুলছে। ধারণা ছিল, বাড়তি তেল বাজার সহজেই শোষণ করবে। কিন্তু বাস্তবে চাহিদা বৃদ্ধির গতি শ্লথ, মজুত বাড়ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উৎপাদক দেশ প্রায় রেকর্ড মাত্রায় তেল তুলছে। ফলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ভারত ও বিনিয়োগ ব্যাংকের সতর্ক পূর্বাভাস
ভারতের এক গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, জুনের মধ্যেই ব্রেন্ট তেল পঞ্চাশ ডলারের আশপাশে নেমে যেতে পারে। এতে দেশটির আমদানিকৃত তেলের দাম কিছুটা কমে মূল্যস্ফীতির চাপ হালকা হলেও বৈশ্বিক বাজারের দুর্বল ভিত্তি স্পষ্ট হবে। একই ধরনের পূর্বাভাস দিয়েছে বড় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোও, যারা বলছে চলতি বছর দৈনিক বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তেল বাজারে জমা হতে পারে।

উদ্বৃত্তের স্থায়িত্বই বড় উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যা শুধু উদ্বৃত্তের পরিমাণ নয়, এর স্থায়িত্ব। আগামী কয়েক বছর নতুন সরবরাহ প্রবাহ অব্যাহত থাকবে বলেই ধারণা। ফলে উৎপাদকরা এখন কার্যত বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, এমন এক সময়ে যখন তেলের ঘাটতির ভয় আর নেই।
ভেনেজুয়েলা কেন প্রভাব ফেলতে পারছে না
এক সময় ভেনেজুয়েলার তেলের খবরেই বাজার উত্তপ্ত হতো। কিন্তু এখন কাগজে থাকা বিপুল মজুত আর বাস্তবে উৎপাদনযোগ্য তেলের মধ্যে ফারাক স্পষ্ট। বছরের পর বছর বিনিয়োগের অভাব, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেশটির তেল কোম্পানিকে দুর্বল করে দিয়েছে। উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন বিপুল অর্থ ও দীর্ঘ সময়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পরও বাজারে বড় উত্থান দেখা যায়নি।

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিতে বাজারের অনীহা
বর্তমানে বাজার কেবল বড় ও তাৎক্ষণিক সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কাতেই সাড়া দিচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুত, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেলের জোগান ভূরাজনৈতিক শঙ্কাকে অনেকটাই নিস্তেজ করেছে।
দামের গন্তব্য কোথায়
সব মিলিয়ে মৌলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাই এখন বাজার চালাচ্ছে। উৎপাদক জোটের বাড়তি তেল, অন্যান্য দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি আর চাহিদার দুর্বলতা একসঙ্গে তেলের দামের কেন্দ্রবিন্দুকে নিচের দিকে টানছে। নীতিতে বড় পরিবর্তন বা বড় কোনো বৈশ্বিক ধাক্কা না এলে অপরিশোধিত তেলের পথ এখনো পঞ্চাশ ডলারের দিকেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















