ইরানে চলমান গণবিক্ষোভ ঘিরে দেশটির সরকারের সঙ্গে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিক্ষোভ দমনে ইরান সহিংস পদ্ধতি ব্যবহার করলে সামরিক হামলার মাধ্যমে সেটির জবাব দেওয়া হবে বলে একাধিকবার হুঁশিয়ার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২,৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
গত শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে ফোনে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে বলে এক খবরে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো হস্তক্ষেপের বিষয়ে ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলেও রয়টার্সের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কড়া সমালোচনা করেছে ইরান।
যেকোনো মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলকে “বৈধ লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে রোববার ইরানের পার্লামেন্টকে জানিয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, “কয়েক লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে” এবং বিক্ষোভের মুখে তারা “পিছু হটবেন না।”
যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা “মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে” বলে মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি।

সর্বোচ্চ সতর্কতায় ইসরায়েল
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, ইসরায়েলের এমন অন্তত তিনটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
তবে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সেবিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
এর আগে, গত জুনে এ ধরনের সতর্ক অবস্থান জানানোর পর যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েছিল ইসরায়েল ও ইরান।
১২ দিনব্যাপী ওই যুদ্ধ চলে, যাতে উভয়পক্ষ হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ওই হামলা যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয় এবং দেশটির পরমাণুকেন্দ্রে বিমান হামলা চালায়।
এ ঘটনার ছয় মাসের মাথায় ইরানে শতাধিক শহরে গণবিক্ষোভ হতে দেখা যাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি বাহিনীর হামলায় ইতোমধ্যে শত শত বিক্ষােভকারী আহত ও নিহত হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েক দিন ধরে লাগাতার হামলার হুমকি দেওয়ার পর শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
“ইরান এখন স্বাধীনতা চায়, হয়ত অন্য যেকােনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করতে পুরােপুরি প্রস্তুত,” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন মি. ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হলেও ইরানে সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত দিতে দেখা যায়নি ইসরায়েলকে।
যদিও ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে দুই চির বৈরী দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত শুক্রবার প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ইসরায়েলের ওপর হামলা চালালে সেটার ‘পরিণতি হবে ভয়াবহ’।
ইরানে যে গণবিক্ষোভ চলছে, সেটির দিতে নজর রাখছেন বলেও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।

বিক্ষোভে অংশ নিলে “সৃষ্টিকর্তার শত্রু”
ইরানে শতাধিত শহরে যে বিক্ষোভ চলছে, তাতে যারা অংশ নিবেন, তাদেরকে “সৃষ্টিকর্তার শত্রু” হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে ঘোষণা করেছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ।
এ ধরনের ‘অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ বলে শনিবার জানিয়েছেন তিনি।
এমন সতর্কতা ও সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করে শনিবার রাস্তায় নামের ইরানে বিক্ষোভকারীরা।
বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে, যাদের অনেকে হতাহত হয়েছেন।
বিবিসি পারসিয়ান নিশ্চিত হয়েছে, রাশত্ শহরের পুরসিনা হাসপাতালে শুক্রবার রাতে ৭০ জনের মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আহত ও নিহত হয়েছেন। স্থানীয় একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪ জন সদস্য এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন।
বিবিসি পারসিয়ান নিশ্চিত হয়েছে, রাশত্ শহরের পুরসিনা হাসপাতালে শুক্রবার রাতে ৭০ জনের মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছিল।
কিন্তু হাসপাতালের মর্গে এত মরদেহ রাখার জায়গা ছিল না, ফলে অনেকের লাশ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিবিসির কাছে ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরেছেন।
সংঘর্ষের ঘটনার পর হাসপাতালটিতে রোগির চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, আহতদের কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) করার পর্যন্ত সময় ছিল না বলে জানিয়েছেন সেখানকার চিকিৎসকরা।
“প্রায় ৩৮ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে…বিশেষ করে যাদের মাথায় ও হৃদপিণ্ডে সরাসরি গুলি লেগেছে,” বলেন তেহরানের ওই হাসপাতালটির একজন চিকিৎসক।

এছাড়া গুলিতে আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন বলে জানা যাচ্ছে।
“সংঘর্ষে এত বেশি মানুষ নিহত হয়েছে যে মর্গে মরদেহ রাখার জায়গা নেই,” বিবিসিকে বলছিলেন তেহরানের ওই হাসপাতালের ওই চিকিৎসক।
এ অবস্থায় একটির ওপর আরেকটি মরদেহ রাখা হয়।
“এক পর্যায়ে মর্গে জায়গা না হওয়ায় প্রার্থনা কক্ষে নিয়ে গিয়ে মরদেহগুলো স্তূপাকারে রাখা হয়,” বলেন হাসপাতালের চিকিৎসক।
হতাহতদের মধ্যে বেশির ভাগই বয়সে তরুণ।
“তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অল্প বয়সে এভাবে প্রাণ হারানোয় তাদের দিকে তাকাতে আমার কষ্ট হচ্ছিল,” বলেন হাসপাতালের আরেক কর্মী।
মরদেহ হস্তান্তরের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতদের স্বজনদের কাছে সাত বিলিয়ন রিয়াল, যা প্রায় সাত হাজার মার্কিন ডলারের সমান অর্থ চেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিবিসি সহ বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের ইরানের ভেতর থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারছে না।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন রয়েছে, যার ফলে তথ্য পাওয়া ও যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে বিক্ষোভ চলাকালে একের পর এক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় এত মানুষ হতাহত হয়েছেন যে অনেক হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
তাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকসহ হাসপাতালগুলোর কর্মীদের।
ইরানের তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বিবিসির সাথে কথা বলেছেন, তারা জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলাে সংঘাত-সহিংসতায় আহত ও নিহতদের ভিড় সামলাতে সমস্যায় পড়ছে।
হতাহতদের বেশিরভাগের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
তেহরানের একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, “অনেক তরুণের মাথায় এবং বুকে সরাসরি গুলি লেগেছে।”
তেহরানের আরেকটি হাসপাতালের কর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শরীরে গুলি এবং রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়ে আসা বহু মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন তারা।

বিক্ষোভের শুরু যেভাবে
দুই সপ্তাহ আগে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি দিয়ে দেশটিতে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষােভ শুরু হয়েছিলাে।
২০২২ সালে তেহরানে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশটিতে হওয়া বিক্ষোভের পর চলমান আন্দোলনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্রমে সে বিক্ষােভ দেশটির সব প্রদেশে এবং শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্রমে তা সহিংস হয়ে ওঠে।
বিক্ষোভ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় সেটি সামাল দিতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর রীতিমত বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে একাধিক সমন্বিত সতর্কতা জারি করেছে ইরানের সরকার।
দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, ‘সশস্ত্র হামলাকারীদের’ বিরুদ্ধে তারা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন।
এদিকে, ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি দেশটির চলমান বিক্ষোভকে “চমৎকার” বলে বর্ণনা করেছেন।

সাধারণ ইরানিদের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
“আমাদের লক্ষ্য এখন আর কেবল রাস্তায় নামা নয়। শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করাই এখনকার লক্ষ্য,” সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন রেজা পাহলভি।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বসবাসরত পাহলভিও এখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।
ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেইন। গত শনিবার তিনি ‘সহিংস দমন-পীড়নের’ নিন্দা জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক শুক্রবার বলেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভে প্রাণহানির ঘটনায় তারা ‘খুবই উদ্বিগ্ন’।
“বিশ্বের সব দেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার জনগণের রয়েছে এবং সরকারের উচিৎ তাদের সেই অধিকার রক্ষা করা,” বলেন তিনি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস শুক্রবার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।
সেখানে তারা ইরানি কর্তৃপক্ষের প্রতি ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার” আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবিসি বাংলা
Sarakhon Report 


















