০২:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ড. ইউনূস, আসিফ নজরুল, শফিকুল আলমসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের ইন্দোনেশীয় প্রকৌশলীদের বিশ্বজয়: মেধাতন্ত্রের কঠিন বাস্তবতায় ‘ব্লুপ্রিন্ট’ গৃহকর্মীর অধিকার আইন: স্বীকৃতির শুরু, শোষণের শেষ নয় ইউএইতে সিঙ্গেল মাদারের ভাগ্যবদল, ষষ্ঠ টিকিটেই জিতলেন ১০ লাখ দিরহাম ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রস্তুত ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে নতুন উত্তেজনা সোভিয়েত স্থাপত্য মুছে যাচ্ছে মধ্য এশিয়া থেকে, নতুন পরিচয় গঠনে ব্যস্ত রাষ্ট্রগুলো ভারতে ডেঙ্গু টিকার শেষ ধাপের পরীক্ষা, এক ডোজেই মিলতে পারে সুরক্ষা উত্তর থাইল্যান্ডে বিষাক্ত ধোঁয়ার দাপট, রক্ত ঝরছে নাক থেকে, বিপর্যস্ত জনজীবন চীনের আফ্রিকা কৌশল: বাণিজ্যের আড়ালে নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র ২৭ মে আরব আমিরাতে পালিত হতে পারে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা

উত্তর থাইল্যান্ডে বিষাক্ত ধোঁয়ার দাপট, রক্ত ঝরছে নাক থেকে, বিপর্যস্ত জনজীবন

উত্তর থাইল্যান্ডজুড়ে ভয়াবহ বায়ুদূষণ নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। দেশটির জনপ্রিয় পর্যটন শহর চিয়াং মাই ও পাহাড়ি এলাকা পাই এখন ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত বাতাসে আচ্ছন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, এবারের দূষণ পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে মানুষের চোখ জ্বালা করছে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।

চিয়াং মাইয়ের নারিকেল বিক্রেতা ৩৬ বছর বয়সী পন ডইকাম বলেন, প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে নাক পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি রক্তের জমাট দাগ দেখতে পান। তার ভাষায়, চারদিকে এমন ধোঁয়া যে মনে হয় যেন সবসময় ধোঁয়ার ফাঁদে আটকে আছেন। জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

দূষণের ভয়াবহতা

থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছরই কৃষিজমিতে আগুন, বনাঞ্চলের দাবানল এবং আবহাওয়াজনিত কারণে দূষণ বাড়ে। তবে এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষক সংস্থা আইকিউএয়ারের তালিকায় চিয়াং মাই কয়েকদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে।

Thailand air pollution: Smoke from forest fires blankets Chiang Mai | CNN

বিশেষ করে পাই এলাকায় পিএম ২.৫ কণার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিছু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৯০০ মাইক্রোগ্রামেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার প্রায় ৬০ গুণ বেশি। এই অতিক্ষুদ্র কণা রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে ধোঁয়া সহজে বের হতে পারছে না। একই সঙ্গে দুর্গম বনাঞ্চলে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। চিয়াং মাই ও পাইয়ের মধ্যবর্তী পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন এলাকায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বৃদ্ধ ও শিশুরা

দূষণের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর। চিয়াং মাইয়ে সরকার কয়েকশ’ “ডাস্ট-ফ্রি রুম” তৈরি করেছে, যেখানে এয়ার পিউরিফায়ার ও বিশেষ বায়ুচাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

৮২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নার্স ওয়াটউইলাই চাইওয়ান জানান, দূষণের কারণে তার মাথা ঘোরা ও মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে গেছে। বাইরে বের হতে এখন ভয় লাগে। তিনি বলেন, এই বাতাসে টিকে থাকতে হলে সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে হয়।

Thailand air pollution: Smoke from forest fires blankets Chiang Mai | CNN

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

চিয়াং মাইয়ের চিকিৎসক থানাক্রিত ইম-ইয়াম জানান, এই দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। তার মতে, বাতাসে থাকা বিষাক্ত উপাদান ও ভারী ধাতু সরাসরি শরীরে প্রবেশ করছে। এতে চোখ জ্বালা, কফ জমা এবং নাকের প্রদাহ বাড়ছে।

তিনি নিজেও ভারী সুরক্ষামূলক মাস্ক ব্যবহার করছেন। তার মতে, ব্যক্তিগতভাবে মানুষ শুধু মাস্ক ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান সরকারের হাতেই।

স্বেচ্ছাসেবকদের লড়াই

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মীরা সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মূলত অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। স্বেচ্ছাসেবক মাইত্রী নুয়ানজা বলেন, প্রশাসন থেকে সামান্য জ্বালানি ও কিছু যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।

সম্প্রতি এক স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, অতিরিক্ত গরম ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি মারা গেছেন।

Air Pollution From Slash-And-Burn Farming Chokes Northern Thailand, Drives Away Tourists | Earth.Org

আইন পাসে চাপ

পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের দাবিও জোরালো হচ্ছে। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সংসদ ভেঙে যাওয়ার কারণে গত বছর যে আইন প্রক্রিয়া থেমে যায়, তা দ্রুত কার্যকর না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

থাইল্যান্ড ক্লিন এয়ার নেটওয়ার্কের আইনজীবী কানংনিজ শ্রিবুয়াইয়াম বলেন, ১৩ মে’র মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে পুরো আইন প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের হতাশা আরও বাড়বে।

পর্যটন খাতেও ধাক্কা

এই দূষণের প্রভাব পড়ছে উত্তর থাইল্যান্ডের পর্যটন শিল্পেও। সাধারণত মার্চ ও এপ্রিল মাসে চিয়াং মাই পর্যটকে ভরা থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। স্থানীয় টুকটুকচালক চাক্রাওয়াত উইচিচাইসিলপ বলেন, শহর এখন অস্বাভাবিকভাবে নির্জন।

ব্রিটিশ পর্যটক মার্টিন অ্যাস্টিল জানান, আগে এই পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নীল আকাশ আর দূরের পাহাড় স্পষ্ট দেখা যেত। এখন পুরো শহর ধূসর কুয়াশায় ঢেকে গেছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তিনি আগে কখনও দেখেননি।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ড. ইউনূস, আসিফ নজরুল, শফিকুল আলমসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের

উত্তর থাইল্যান্ডে বিষাক্ত ধোঁয়ার দাপট, রক্ত ঝরছে নাক থেকে, বিপর্যস্ত জনজীবন

০১:২৩:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

উত্তর থাইল্যান্ডজুড়ে ভয়াবহ বায়ুদূষণ নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। দেশটির জনপ্রিয় পর্যটন শহর চিয়াং মাই ও পাহাড়ি এলাকা পাই এখন ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত বাতাসে আচ্ছন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, এবারের দূষণ পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে মানুষের চোখ জ্বালা করছে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।

চিয়াং মাইয়ের নারিকেল বিক্রেতা ৩৬ বছর বয়সী পন ডইকাম বলেন, প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে নাক পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি রক্তের জমাট দাগ দেখতে পান। তার ভাষায়, চারদিকে এমন ধোঁয়া যে মনে হয় যেন সবসময় ধোঁয়ার ফাঁদে আটকে আছেন। জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

দূষণের ভয়াবহতা

থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছরই কৃষিজমিতে আগুন, বনাঞ্চলের দাবানল এবং আবহাওয়াজনিত কারণে দূষণ বাড়ে। তবে এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষক সংস্থা আইকিউএয়ারের তালিকায় চিয়াং মাই কয়েকদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে।

Thailand air pollution: Smoke from forest fires blankets Chiang Mai | CNN

বিশেষ করে পাই এলাকায় পিএম ২.৫ কণার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিছু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে এই মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৯০০ মাইক্রোগ্রামেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার প্রায় ৬০ গুণ বেশি। এই অতিক্ষুদ্র কণা রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে ধোঁয়া সহজে বের হতে পারছে না। একই সঙ্গে দুর্গম বনাঞ্চলে আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। চিয়াং মাই ও পাইয়ের মধ্যবর্তী পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন এলাকায় আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বৃদ্ধ ও শিশুরা

দূষণের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর। চিয়াং মাইয়ে সরকার কয়েকশ’ “ডাস্ট-ফ্রি রুম” তৈরি করেছে, যেখানে এয়ার পিউরিফায়ার ও বিশেষ বায়ুচাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

৮২ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নার্স ওয়াটউইলাই চাইওয়ান জানান, দূষণের কারণে তার মাথা ঘোরা ও মাইগ্রেনের সমস্যা বেড়ে গেছে। বাইরে বের হতে এখন ভয় লাগে। তিনি বলেন, এই বাতাসে টিকে থাকতে হলে সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে হয়।

Thailand air pollution: Smoke from forest fires blankets Chiang Mai | CNN

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

চিয়াং মাইয়ের চিকিৎসক থানাক্রিত ইম-ইয়াম জানান, এই দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। তার মতে, বাতাসে থাকা বিষাক্ত উপাদান ও ভারী ধাতু সরাসরি শরীরে প্রবেশ করছে। এতে চোখ জ্বালা, কফ জমা এবং নাকের প্রদাহ বাড়ছে।

তিনি নিজেও ভারী সুরক্ষামূলক মাস্ক ব্যবহার করছেন। তার মতে, ব্যক্তিগতভাবে মানুষ শুধু মাস্ক ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান সরকারের হাতেই।

স্বেচ্ছাসেবকদের লড়াই

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মীরা সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মূলত অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। স্বেচ্ছাসেবক মাইত্রী নুয়ানজা বলেন, প্রশাসন থেকে সামান্য জ্বালানি ও কিছু যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।

সম্প্রতি এক স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, অতিরিক্ত গরম ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি মারা গেছেন।

Air Pollution From Slash-And-Burn Farming Chokes Northern Thailand, Drives Away Tourists | Earth.Org

আইন পাসে চাপ

পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের দাবিও জোরালো হচ্ছে। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সংসদ ভেঙে যাওয়ার কারণে গত বছর যে আইন প্রক্রিয়া থেমে যায়, তা দ্রুত কার্যকর না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

থাইল্যান্ড ক্লিন এয়ার নেটওয়ার্কের আইনজীবী কানংনিজ শ্রিবুয়াইয়াম বলেন, ১৩ মে’র মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে পুরো আইন প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের হতাশা আরও বাড়বে।

পর্যটন খাতেও ধাক্কা

এই দূষণের প্রভাব পড়ছে উত্তর থাইল্যান্ডের পর্যটন শিল্পেও। সাধারণত মার্চ ও এপ্রিল মাসে চিয়াং মাই পর্যটকে ভরা থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। স্থানীয় টুকটুকচালক চাক্রাওয়াত উইচিচাইসিলপ বলেন, শহর এখন অস্বাভাবিকভাবে নির্জন।

ব্রিটিশ পর্যটক মার্টিন অ্যাস্টিল জানান, আগে এই পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নীল আকাশ আর দূরের পাহাড় স্পষ্ট দেখা যেত। এখন পুরো শহর ধূসর কুয়াশায় ঢেকে গেছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তিনি আগে কখনও দেখেননি।