বিশ্বজুড়ে সাফল্যের গল্প সাধারণত ঝকঝকে অনুপ্রেরণামূলক ভাষায় তুলে ধরা হয়। কিন্তু সিলভি তানাগার লেখা ‘ব্লুপ্রিন্ট’ বইটি সেই প্রচলিত ধারা থেকে ভিন্ন। এখানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করা ইন্দোনেশীয় প্রকৌশলীদের জীবনকে দেখানো হয়েছে বাস্তবতার কঠিন আলোয়—যেখানে মেধা, চাপ, ত্যাগ আর টিকে থাকার লড়াই একসঙ্গে মিশে আছে।
‘ব্লুপ্রিন্ট: পেতুয়ালাঙ্গান পুত্রা-পুত্রি ইন্দোনেশিয়া…’ শীর্ষক বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে ২০ জন ইন্দোনেশীয় প্রকৌশলীর অভিজ্ঞতা, যারা বৈশ্বিক জ্বালানি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শ্লামবার্জার—বর্তমানে এসএলবি—এ কাজ করেছেন। তাদের কর্মজীবন ছড়িয়ে আছে ১২০টিরও বেশি দেশে। বইটি শুধু প্রযুক্তিগত কাজের বিবরণ নয়; বরং মানুষের মানসিক শক্তি, অভিযোজন ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের গল্প।
মেধাতন্ত্রের কঠিন বাস্তবতা

বইটিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, এসএলবির মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সহজ নয়। প্রকৌশলীদের যেকোনো সময় বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পাঠানো হতে পারে। কখনও দূরবর্তী সমুদ্রাঞ্চলে, কখনও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। কাজের চাপের পাশাপাশি মানসিক চাপও ছিল ভয়াবহ। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, চরম ক্লান্তি এবং একাকিত্ব—সবকিছুই ছিল এই পেশার অংশ।
সিলভি তানাগা দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরিবেশে কারও পরিচয় বা জাতীয়তা প্রথমে নজর কাড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, ধারাবাহিকতা এবং সঠিক মনোভাব। মেধাতন্ত্র এখানে যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি ক্রমাগত নিজেকে প্রমাণ করার চাপও তৈরি করে।
ঝুঁকি, ক্লান্তি ও সহনশীলতার গল্প
বইটির কয়েকটি অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম রালদিয়ার্তো ‘রাল’ কোয়েস্তোরের অভিজ্ঞতা। তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে ইরানে কাজ করেন, যখন দেশটি ইরানি বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছিল। পরে তাকে পাকিস্তানে পাঠানো হয়, যেখানে সীমান্তসংঘাত ছিল দৈনন্দিন বাস্তবতা। ধীরে ধীরে অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উপস্থিতিও তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

আরেক প্রকৌশলী ফয়সাল উইংকির অভিজ্ঞতা আরও চমকে দেওয়ার মতো। একটি জটিল প্রকল্পের সময় তিনি টানা পাঁচ দিন না ঘুমিয়ে কাজ করেছিলেন বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সময় বিকল্প কর্মী না থাকায় প্রকৌশলীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব বহন করতে হতো। লেখক এই ঘটনাগুলোকে বীরত্ব হিসেবে নয়, বরং কর্মব্যবস্থার কঠোর বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পরিবার ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার প্রভাব
তবে বইটি শুধু কষ্টের বর্ণনা নয়। আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার ফলে প্রকৌশলীরা পেয়েছেন বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি, বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। পরিবারের সদস্যরাও এই যাত্রার অংশ হয়েছেন। বিশেষ করে সন্তানরা বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশের বহু পরিবারের নাগালের বাইরে।
প্রযুক্তিগত বিষয়কে জটিল না করে সহজ মানবিক ভাষায় উপস্থাপন করাই বইটির বড় শক্তি। ফলে এটি শুধু প্রকৌশলীদের জন্য নয়, যেকোনো পেশাজীবীর জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মেধাভিত্তিক ব্যবস্থায় টিকে থাকা, সাংস্কৃতিক পার্থক্যের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং চাপে স্থির থাকার মতো বিষয়গুলো বইটির কেন্দ্রীয় বার্তা হয়ে উঠেছে।
তবে বইটি মূলত সফলদের গল্পকেই সামনে এনেছে। বৈশ্বিক সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে তুলনামূলক কম আলোচনা রয়েছে। তারপরও ‘ব্লুপ্রিন্ট’ দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইন্দোনেশিয়ার উপস্থিতি কেবল স্লোগানে নয়, বরং প্রতিদিনের পেশাদারিত্ব ও অর্জিত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বইটির ইংরেজি অনুবাদ ২০২৬ সালে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















