বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা ডেঙ্গু সংক্রমণের মধ্যে ভারত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে। দেশটির একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এমন একটি ডেঙ্গু টিকার চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষা চালাচ্ছে, যা সফল হলে বিশ্বের প্রথম দিকের এক ডোজের ডেঙ্গু টিকাগুলোর একটি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু ভারতের জন্য নয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বহু দেশের জন্যও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ডেঙ্গু এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মশাবাহিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ বর্তমানে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর ১০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ভারতে ২০২১ সালের পর থেকে ১০ লাখের বেশি সংক্রমণ এবং অন্তত ১,৫০০ মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে।
চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা শুরু
ভারতের প্যানাসিয়া বায়োটেক নামের প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫ বছর ধরে ‘ডেঙ্গিঅল’ নামে টিকাটি তৈরি করছে। বর্তমানে দেশজুড়ে ১০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবীর ওপর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চলছে। এই গবেষণা তদারকি করছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ। পরীক্ষার ফল ইতিবাচক হলে আগামী বছর থেকেই টিকাটি বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
![]()
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ খালিদ আলী বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব এই টিকা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে কার্যকর টিকা এখন জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। শহরাঞ্চলে রোগীর ভিড় বাড়ছে, আর গ্রামীণ এলাকায় দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া ও চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু সংক্রমণও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তাদের মধ্যে মারাত্মক ডেঙ্গু জ্বরের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
এক ডোজ টিকার সম্ভাবনা

ডেঙ্গুর চারটি ভিন্ন ধরন বা সেরোটাইপ থাকায় কার্যকর টিকা তৈরি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একটি ধরনে সংক্রমণ থেকে তৈরি হওয়া প্রতিরোধক্ষমতা অন্য ধরন থেকে সুরক্ষা দেয় না। বরং দ্বিতীয়বার সংক্রমণ আরও গুরুতর হতে পারে। এ কারণেই অধিকাংশ বিদ্যমান টিকায় একাধিক ডোজ প্রয়োজন হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ডেঙ্গিঅল’ সফল হলে তা বিশ্বের প্রথম সারির এক ডোজের ডেঙ্গু টিকাগুলোর একটি হবে। ব্রাজিল গত বছর একই ধরনের একটি টিকার অনুমোদন দিয়েছে। ভারতে এখনও পর্যন্ত জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য কোনো ডেঙ্গু টিকা অনুমোদিত নয়।
গবেষকদের দাবি, টিকাটি এক থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য কার্যকর হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার ফলাফলই নির্ধারণ করবে এটি নিরাপদ ও কার্যকর কি না।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ভাইরোলজিস্ট শাহিদ জামিল সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে তিনি মনে করেন, সফল টিকা আবিষ্কার ভবিষ্যতের জন্য আশার বড় ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















