ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা এখন কার্যত অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। বিমানবাহী রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, মেরিন ইউনিট এবং যুদ্ধবিমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখলেও হোয়াইট হাউসের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক মাস আগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের ঘোষণা দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করেন। “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে পরিচিত এই অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অভিযানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু ট্রাম্প পরে দাবি করেন, সেই কার্যক্রমও আপাতত স্থগিত রয়েছে।

এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরান “সম্মত হওয়া বিষয়গুলো” মেনে নিলে যুদ্ধ বন্ধ করা হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে। তবে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, সমঝোতা না হলে আবারও বোমা হামলা শুরু হতে পারে।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা
বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কার্যত অবরোধ বজায় রেখেছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত করার পর থেকেই এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। সম্প্রতি একটি ইরানি পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে মার্কিন যুদ্ধবিমান সেটিকে অচল করে দেয়।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এখন আগের চেয়ে আরও দৃশ্যমান।

কোথায় অবস্থান করছে মার্কিন বাহিনী
যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ হাজার সেনা ছিল। তারা সৌদি আরব, বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে অবস্থান করছিল। পরে সেনা সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
এর মধ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। তাদের অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, প্রয়োজনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের অভিযানে এই বাহিনী ব্যবহার করা হতে পারে।
একইভাবে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের আড়াই হাজার মেরিন এবং সমসংখ্যক নৌসেনাও অঞ্চলে রয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্বীপ বা কৌশলগত এলাকা দখলের অভিযানে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে।

বিশেষ অভিযান বাহিনীর সদস্যরাও মার্চ মাসে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। সামরিক সূত্রের দাবি, ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ঘিরে সম্ভাব্য অভিযানে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজের শক্তি প্রদর্শন
আরব সাগরে অবস্থান করছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। এই দুটি রণতরীর সঙ্গে রয়েছে একাধিক যুদ্ধজাহাজ এবং ১০ হাজারের বেশি নৌ ও মেরিন সদস্য। এখান থেকে যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
মার্কিন সামরিক বাহিনী আপাতত সরাসরি বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক সেনা মোতায়েন ও যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেলে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি রেখেছে।
ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভিন্নমুখী বার্তায় যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















