তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবের একটি পুরোনো অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের গায়ে এখনো টিকে আছে বিশাল এক মোজাইকচিত্র। সেখানে মহাকাশচারী ও প্রকৌশলীদের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈজ্ঞানিক সাফল্যের গল্প। কিন্তু ভবনটির মতো সেই শিল্পকর্মও আর বেশিদিন থাকবে না। নতুন আবাসন প্রকল্প নির্মাণের জন্য পুরো ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সোভিয়েত যুগের স্থাপত্য, ভাস্কর্য, মোজাইক ও দেয়ালচিত্র দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার প্রভাব থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের জাতীয় পরিচয়কে সামনে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তাজিকিস্তানের মোজাইক শিল্পী জ্যামশেদ জুরায়েভ বলেন, পুরোনো কোনো ভবন নতুন নগর পরিকল্পনার সঙ্গে না মিললে সেটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। শহরগুলো নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের স্মৃতিও।
![]()
নতুন নগরায়ণ, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ৩৫ বছর পর কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান নিজেদের নতুন রাষ্ট্রপরিচয় গঠনে মনোযোগী হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শহরের স্থাপত্যেও। কোথাও উঁচু আধুনিক ভবন, কোথাও স্তালিন যুগের পুরোনো স্থাপনা, আবার কোথাও অর্ধসমাপ্ত নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে নগরচিত্রে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
কিরগিজস্তানের স্থাপত্য সংরক্ষণ উদ্যোগ ‘আর্টকানা’র সহপ্রতিষ্ঠাতা আলতিনাই কুদাইবার্গেনোভা বলেন, অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। তাঁর আশঙ্কা, বিশকেক শহরের সমাজতান্ত্রিক আধুনিকতাবাদী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।
এই স্থাপত্যশৈলী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি আগ্রহ খুবই কম।
ক্ষমতার নতুন প্রতীক
বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থাপত্য পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করছে। বর্তমান শাসকেরা নিজেদের নতুন যুগের নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। ফলে সোভিয়েত অতীতের প্রতীকগুলোর জন্য খুব বেশি জায়গা থাকছে না।

তাজিকিস্তানে বহু পুরোনো মোজাইক ভেঙে ফেলার জায়গায় এখন দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক ইমোমালি রাহমনের প্রতিকৃতি দেখা যাচ্ছে। যদিও সরকারি ভাষ্য হলো, জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের চেয়ে নতুন ভবন নির্মাণ সাশ্রয়ী এবং দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য আরও আবাসনের প্রয়োজন রয়েছে।
দুশানবের ভাস্কর সাফারবেক কসিমভ বলেন, শহরকে আরও সুন্দর ও আধুনিক করার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, সোভিয়েত যুগের মোজাইকগুলো এখন আর প্রয়োজনীয় নয়।
শিল্প বনাম ব্যবসা
তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই শিল্পকর্মগুলোর রাজনৈতিক বার্তা থাকলেও তাদের শিল্পমূল্য অস্বীকার করা যায় না। আলতিনাই কুদাইবার্গেনোভা বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব প্রায়ই উপেক্ষিত হচ্ছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্য বেশি দামে জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রি করা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য এশিয়ার অনেক রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে দুর্নীতি ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।
কিরগিজ শিল্পী এরকিনবেক বলঝুরভ বলেন, শহরের উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা স্মৃতি মুছে ফেলার বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, পুরোনো ভবনগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বহু শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গল্প।
ভবিষ্যতের আশা
মধ্য এশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মতামত খুব কমই গুরুত্ব পায়। তারপরও তাজিক শিল্পী জুরায়েভ আশা ছাড়ছেন না। তাঁর বিশ্বাস, একদিন আবার নতুন ভবনের দেয়ালে মোজাইক ফিরে আসবে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা যদি গুরুত্ব দেন, তাহলে এই শিল্পধারার পুনর্জাগরণ সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















