০২:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ড. ইউনূস, আসিফ নজরুল, শফিকুল আলমসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের ইন্দোনেশীয় প্রকৌশলীদের বিশ্বজয়: মেধাতন্ত্রের কঠিন বাস্তবতায় ‘ব্লুপ্রিন্ট’ গৃহকর্মীর অধিকার আইন: স্বীকৃতির শুরু, শোষণের শেষ নয় ইউএইতে সিঙ্গেল মাদারের ভাগ্যবদল, ষষ্ঠ টিকিটেই জিতলেন ১০ লাখ দিরহাম ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রস্তুত ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে নতুন উত্তেজনা সোভিয়েত স্থাপত্য মুছে যাচ্ছে মধ্য এশিয়া থেকে, নতুন পরিচয় গঠনে ব্যস্ত রাষ্ট্রগুলো ভারতে ডেঙ্গু টিকার শেষ ধাপের পরীক্ষা, এক ডোজেই মিলতে পারে সুরক্ষা উত্তর থাইল্যান্ডে বিষাক্ত ধোঁয়ার দাপট, রক্ত ঝরছে নাক থেকে, বিপর্যস্ত জনজীবন চীনের আফ্রিকা কৌশল: বাণিজ্যের আড়ালে নতুন ভূরাজনৈতিক মানচিত্র ২৭ মে আরব আমিরাতে পালিত হতে পারে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা

গৃহকর্মীর অধিকার আইন: স্বীকৃতির শুরু, শোষণের শেষ নয়

ইন্দোনেশিয়ায় গৃহকর্মীরা বহু দশক ধরে এমন এক শ্রমব্যবস্থার অংশ, যেখানে শ্রম আছে, দায়িত্ব আছে, নির্ভরশীলতা আছে—কিন্তু অধিকার নেই। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অল্প মজুরি, ব্যক্তিগত অপমান, এমনকি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাও সেখানে অস্বাভাবিক নয়। এই শ্রমিকদের কাজকে দীর্ঘদিন ‘পারিবারিক সহায়তা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, ফলে রাষ্ট্রও তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনীহা দেখিয়েছে। সম্প্রতি পাস হওয়া গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন সেই পুরোনো বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, আইনটি আধুনিক দাসত্বের কাঠামো ভাঙতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

২২ বছর ধরে ঝুলে থাকার পর আইনটি অবশেষে পাস হয়েছে। এই দীর্ঘ বিলম্ব শুধু সংসদের অনাগ্রহ নয়, বরং সমাজের মধ্যবিত্ত ও শহুরে শ্রেণির নৈতিক দ্বিধাকেও প্রকাশ করে। কারণ গৃহকর্মীর শ্রমের ওপর নির্ভরশীল একটি সমাজ খুব কমই চায় সেই শ্রমের পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ হোক। আইনটি পাসের পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথাও বলা হচ্ছে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসন এটিকে শ্রমিকবান্ধব অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু আইনের প্রকৃত শক্তি কেবল তার রাজনৈতিক প্রতীকত্বে নয়, বাস্তব প্রয়োগে। আর সেখানেই দুর্বলতা স্পষ্ট।

Indonesia: Domestic workers legally recognised after '22-year struggle'

নতুন আইনে গৃহকর্মীদের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। এতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার মতো কিছু মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এসব অধিকারের প্রয়োগ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা অস্পষ্ট। নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে চুক্তির কথা বলা হলেও, দুই পক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য যে সম্পূর্ণ অসম, সে বাস্তবতা আইনটি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। দরিদ্র এক নারী, যিনি চাকরির প্রয়োজনে শহরে এসেছেন, তিনি কাগজে-কলমে কতটা দরকষাকষি করতে পারবেন? বাস্তবে সেই চুক্তি কতটা ন্যায্য হবে?

আইনটি “যৌক্তিক মজুরি”, “মানবিক কর্মঘণ্টা” কিংবা “ছুটি”র মতো বিষয় উল্লেখ করলেও সেগুলোর নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেনি। অর্থাৎ শ্রমিকের অধিকার শেষ পর্যন্ত নিয়োগকর্তার সদিচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল থেকে যাচ্ছে। এটি আসলে শ্রম আইন নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক আহ্বান। অথচ গৃহশ্রমের ক্ষেত্রটি এমন যেখানে শোষণ প্রাতিষ্ঠানিক এবং অদৃশ্য—কারণ কাজের জায়গাটি ব্যক্তিগত বাড়ি, যা বাইরের নজরদারির বাইরে থাকে।

ইন্দোনেশিয়ার গৃহকর্মী অধিকারকর্মীরা বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৮৯ অনুসারে পূর্ণ সুরক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন। সেই কনভেনশন গৃহকর্মীদের অন্যান্য শ্রমিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু নতুন আইনটি সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি বলে সমালোচনা উঠেছে। বিশেষ করে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও শ্রমঘণ্টা নিয়ে স্পষ্ট সুরক্ষা না থাকায় উদ্বেগ রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে গৃহকর্মীদের ওপর সহিংসতার এক হাজারের বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে যৌন সহিংসতার ঘটনাও ছিল। বাস্তবে এমন আরও বহু ঘটনা প্রকাশই পায় না।

A long road to recognition: domestic workers' rights in Indonesia |  International Labour Organization

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, বিদেশে কর্মরত ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মীদের জন্য সরকার কঠোর চুক্তি, নির্দিষ্ট মজুরি ও আইনি সুরক্ষার দাবি তোলে, কিন্তু দেশের ভেতরে একই ধরনের সুরক্ষা দিতে এত বছর লেগে গেল। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল আইনের অভাব নয়; এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও সংকট। শহুরে পরিবারগুলো গৃহকর্মী চায়, কিন্তু তাদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য দিতে চায় না। সস্তা শ্রমের এই সংস্কৃতি ভাঙা ছাড়া গৃহকর্মীদের অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

নতুন আইন তাই একটি সূচনা—সমাধান নয়। এটি গৃহকর্মীদের দৃশ্যমান করেছে, রাষ্ট্রের ভাষায় তাদের “শ্রমিক” হিসেবে স্থান দিয়েছে। কিন্তু আইনি স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই স্বীকৃতি বাস্তব জীবনে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিকে রূপ নেবে। অন্যথায় আধুনিক দাসত্ব শুধু নতুন ভাষা পাবে, চরিত্র বদলাবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ড. ইউনূস, আসিফ নজরুল, শফিকুল আলমসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের

গৃহকর্মীর অধিকার আইন: স্বীকৃতির শুরু, শোষণের শেষ নয়

০২:১৬:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ায় গৃহকর্মীরা বহু দশক ধরে এমন এক শ্রমব্যবস্থার অংশ, যেখানে শ্রম আছে, দায়িত্ব আছে, নির্ভরশীলতা আছে—কিন্তু অধিকার নেই। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অল্প মজুরি, ব্যক্তিগত অপমান, এমনকি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাও সেখানে অস্বাভাবিক নয়। এই শ্রমিকদের কাজকে দীর্ঘদিন ‘পারিবারিক সহায়তা’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, ফলে রাষ্ট্রও তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনীহা দেখিয়েছে। সম্প্রতি পাস হওয়া গৃহকর্মী সুরক্ষা আইন সেই পুরোনো বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, আইনটি আধুনিক দাসত্বের কাঠামো ভাঙতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

২২ বছর ধরে ঝুলে থাকার পর আইনটি অবশেষে পাস হয়েছে। এই দীর্ঘ বিলম্ব শুধু সংসদের অনাগ্রহ নয়, বরং সমাজের মধ্যবিত্ত ও শহুরে শ্রেণির নৈতিক দ্বিধাকেও প্রকাশ করে। কারণ গৃহকর্মীর শ্রমের ওপর নির্ভরশীল একটি সমাজ খুব কমই চায় সেই শ্রমের পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ হোক। আইনটি পাসের পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথাও বলা হচ্ছে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসন এটিকে শ্রমিকবান্ধব অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু আইনের প্রকৃত শক্তি কেবল তার রাজনৈতিক প্রতীকত্বে নয়, বাস্তব প্রয়োগে। আর সেখানেই দুর্বলতা স্পষ্ট।

Indonesia: Domestic workers legally recognised after '22-year struggle'

নতুন আইনে গৃহকর্মীদের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। এতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার মতো কিছু মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এসব অধিকারের প্রয়োগ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা অস্পষ্ট। নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে চুক্তির কথা বলা হলেও, দুই পক্ষের ক্ষমতার ভারসাম্য যে সম্পূর্ণ অসম, সে বাস্তবতা আইনটি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। দরিদ্র এক নারী, যিনি চাকরির প্রয়োজনে শহরে এসেছেন, তিনি কাগজে-কলমে কতটা দরকষাকষি করতে পারবেন? বাস্তবে সেই চুক্তি কতটা ন্যায্য হবে?

আইনটি “যৌক্তিক মজুরি”, “মানবিক কর্মঘণ্টা” কিংবা “ছুটি”র মতো বিষয় উল্লেখ করলেও সেগুলোর নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেনি। অর্থাৎ শ্রমিকের অধিকার শেষ পর্যন্ত নিয়োগকর্তার সদিচ্ছার ওপরই নির্ভরশীল থেকে যাচ্ছে। এটি আসলে শ্রম আইন নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক আহ্বান। অথচ গৃহশ্রমের ক্ষেত্রটি এমন যেখানে শোষণ প্রাতিষ্ঠানিক এবং অদৃশ্য—কারণ কাজের জায়গাটি ব্যক্তিগত বাড়ি, যা বাইরের নজরদারির বাইরে থাকে।

ইন্দোনেশিয়ার গৃহকর্মী অধিকারকর্মীরা বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৮৯ অনুসারে পূর্ণ সুরক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন। সেই কনভেনশন গৃহকর্মীদের অন্যান্য শ্রমিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। কিন্তু নতুন আইনটি সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি বলে সমালোচনা উঠেছে। বিশেষ করে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও শ্রমঘণ্টা নিয়ে স্পষ্ট সুরক্ষা না থাকায় উদ্বেগ রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে গৃহকর্মীদের ওপর সহিংসতার এক হাজারের বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে যৌন সহিংসতার ঘটনাও ছিল। বাস্তবে এমন আরও বহু ঘটনা প্রকাশই পায় না।

A long road to recognition: domestic workers' rights in Indonesia |  International Labour Organization

সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, বিদেশে কর্মরত ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মীদের জন্য সরকার কঠোর চুক্তি, নির্দিষ্ট মজুরি ও আইনি সুরক্ষার দাবি তোলে, কিন্তু দেশের ভেতরে একই ধরনের সুরক্ষা দিতে এত বছর লেগে গেল। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল আইনের অভাব নয়; এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও সংকট। শহুরে পরিবারগুলো গৃহকর্মী চায়, কিন্তু তাদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য দিতে চায় না। সস্তা শ্রমের এই সংস্কৃতি ভাঙা ছাড়া গৃহকর্মীদের অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

নতুন আইন তাই একটি সূচনা—সমাধান নয়। এটি গৃহকর্মীদের দৃশ্যমান করেছে, রাষ্ট্রের ভাষায় তাদের “শ্রমিক” হিসেবে স্থান দিয়েছে। কিন্তু আইনি স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই স্বীকৃতি বাস্তব জীবনে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিকে রূপ নেবে। অন্যথায় আধুনিক দাসত্ব শুধু নতুন ভাষা পাবে, চরিত্র বদলাবে না।