০১:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
নীরব জাঁকজমকের ভাষা: দুবাইয়ে দামিয়ানির নতুন অধ্যায়ে জেসিকা চ্যাস্টেইনের আলো ভাড়া না কেনা, কেনা না ভাড়া: সুদের ভবিষ্যৎ যেদিকে, সিদ্ধান্তও সেদিকেই ইউরোপের বন্ডে ধসের আভাস, ডাচ পেনশনের সরে দাঁড়ানোয় ঋণচাপে সরকারগুলো ভিয়েতনামের দ্রুত বৃদ্ধি, নড়বড়ে ভিত: উন্নয়নের জোয়ারে ঝুঁকির ছায়া আবারও মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, পাল্টাপাল্টি হামলার হুমকি যুক্তরাষ্ট্র ৬৬ সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে আবার নির্বাচনের দৌড়ে মান্না, বগুড়া-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন সূচকের বড় পতনে ডিএসই ও সিএসইতে লেনদেন কমল বাংলাদেশের অচলাবস্থা আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহর জন্য কঠিন পরীক্ষা: এনডিটিভি প্রতিবেদন বিক্ষোভের চাপে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি

গ্রিনল্যান্ড সংকটে ডেনমার্ক: যে ভূখণ্ড নিজেই দূরে সরে যাচ্ছে, তাকে রক্ষার লড়াই

ডেনমার্ক আজ এমন এক ভূখণ্ড রক্ষার কূটনৈতিক লড়াইয়ে নেমেছে, যে ভূখণ্ডটি ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে সরে স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছে। ১৯৭৯ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিকতায় গ্রিনল্যান্ডে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা গভীর হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ও চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কূটনৈতিক চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের বৈঠক হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে সব পথ খোলা রাখা হয়েছে। খনিজসমৃদ্ধ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থান থেকেই ওয়াশিংটনের আগ্রহ বাড়ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন, যা ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

Image

ইউরোপীয় সংহতি, কিন্তু অস্বস্তিকর বাস্তবতা
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে ডেনমার্ক-এর পাশে দাঁড়ালেও বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যার বড় অংশ স্বাধীনতা চায় এবং প্রধান বিরোধী দল কোপেনহেগেনকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। এতে ডেনমার্কের কূটনৈতিক বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কৌশলগত গুরুত্ব ও আর্কটিক সমীকরণ
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝখানে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে ডেনমার্কের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের মূল ভরকেন্দ্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড হাতছাড়া হলে আর্কটিকে ডেনমার্কের প্রভাব মারাত্মকভাবে কমে যাবে। একই সঙ্গে ইউরোপের মিত্ররা আশঙ্কা করছে, গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দেওয়া হলে ছোট রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ভূখণ্ড দাবি করার বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট বার্তা
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ও গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে বলেছেন, রাষ্ট্রের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীর। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কোপেনহেগেন স্পষ্ট করেছে, জোরপূর্বক দখল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডেনমার্ক আরও সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়, তবে জোটের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

গ্রিনল্যান্ড কার্ড ও ইতিহাসের ভার
শীতল যুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান ডেনমার্ককে ওয়াশিংটনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। এই সুবিধাকে অনেকেই গ্রিনল্যান্ড কার্ড বলে উল্লেখ করেন। তবে ২০০৯ সালের চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডবাসীর স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হওয়ায় এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আগেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক মার্কিন চাপ সেই অনিশ্চয়তাকে আরও দ্রুত সামনে নিয়ে এসেছে।

Image

অর্থনৈতিক বোঝা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়
ডেনমার্ক প্রতিবছর গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতিতে বিপুল অনুদান দেয়। স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে সেখানে টেকসই অর্থব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ও কোপেনহেগেন বহন করে। এর পাশাপাশি আর্কটিক প্রতিরক্ষায় নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘোষণা করা হয়েছে, যা ডেনমার্কের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

রাজনীতি, অনুভূতি ও কঠিন ভারসাম্য
ডেনমার্কে অনেকেই এই সম্পর্ককে কেবল অর্থনীতি বা প্রতিরক্ষার হিসাবে দেখতে নারাজ। শতাব্দীর সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনের কথাও উঠে আসছে। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি ও রাশিয়ার বাড়তে থাকা হুমকি ডেনমার্ককে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনেও এই ইস্যু নীরবে চাপ তৈরি করছে।

আর্কটিকের সম্পদ ও ভবিষ্যৎ পথ
গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরভাগ বরফে ঢাকা হলেও উপকূলীয় এলাকায় খনিজ উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্পদ ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার অর্থনৈতিক ভিত্তি হতে পারে। ফলে ডেনমার্ক আজ এমন এক ভূখণ্ড রক্ষায় কূটনৈতিক শক্তি খরচ করছে, যে ভূখণ্ডের শেষ সিদ্ধান্ত নেবে সেখানকার মানুষই।

জনপ্রিয় সংবাদ

নীরব জাঁকজমকের ভাষা: দুবাইয়ে দামিয়ানির নতুন অধ্যায়ে জেসিকা চ্যাস্টেইনের আলো

গ্রিনল্যান্ড সংকটে ডেনমার্ক: যে ভূখণ্ড নিজেই দূরে সরে যাচ্ছে, তাকে রক্ষার লড়াই

০৬:৩৫:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

ডেনমার্ক আজ এমন এক ভূখণ্ড রক্ষার কূটনৈতিক লড়াইয়ে নেমেছে, যে ভূখণ্ডটি ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে সরে স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছে। ১৯৭৯ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিকতায় গ্রিনল্যান্ডে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা গভীর হয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ও চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কূটনৈতিক চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের বৈঠক হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে সব পথ খোলা রাখা হয়েছে। খনিজসমৃদ্ধ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থান থেকেই ওয়াশিংটনের আগ্রহ বাড়ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন, যা ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

Image

ইউরোপীয় সংহতি, কিন্তু অস্বস্তিকর বাস্তবতা
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে ডেনমার্ক-এর পাশে দাঁড়ালেও বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যার বড় অংশ স্বাধীনতা চায় এবং প্রধান বিরোধী দল কোপেনহেগেনকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। এতে ডেনমার্কের কূটনৈতিক বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কৌশলগত গুরুত্ব ও আর্কটিক সমীকরণ
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝখানে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে ডেনমার্কের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের মূল ভরকেন্দ্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রয়েছে। গ্রিনল্যান্ড হাতছাড়া হলে আর্কটিকে ডেনমার্কের প্রভাব মারাত্মকভাবে কমে যাবে। একই সঙ্গে ইউরোপের মিত্ররা আশঙ্কা করছে, গ্রিনল্যান্ড ছেড়ে দেওয়া হলে ছোট রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে ভূখণ্ড দাবি করার বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে স্পষ্ট বার্তা
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ও গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে বলেছেন, রাষ্ট্রের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীর। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কোপেনহেগেন স্পষ্ট করেছে, জোরপূর্বক দখল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডেনমার্ক আরও সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়, তবে জোটের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

গ্রিনল্যান্ড কার্ড ও ইতিহাসের ভার
শীতল যুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান ডেনমার্ককে ওয়াশিংটনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। এই সুবিধাকে অনেকেই গ্রিনল্যান্ড কার্ড বলে উল্লেখ করেন। তবে ২০০৯ সালের চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডবাসীর স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হওয়ায় এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আগেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক মার্কিন চাপ সেই অনিশ্চয়তাকে আরও দ্রুত সামনে নিয়ে এসেছে।

Image

অর্থনৈতিক বোঝা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়
ডেনমার্ক প্রতিবছর গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতিতে বিপুল অনুদান দেয়। স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে সেখানে টেকসই অর্থব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ও কোপেনহেগেন বহন করে। এর পাশাপাশি আর্কটিক প্রতিরক্ষায় নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘোষণা করা হয়েছে, যা ডেনমার্কের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

রাজনীতি, অনুভূতি ও কঠিন ভারসাম্য
ডেনমার্কে অনেকেই এই সম্পর্ককে কেবল অর্থনীতি বা প্রতিরক্ষার হিসাবে দেখতে নারাজ। শতাব্দীর সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও পারিবারিক বন্ধনের কথাও উঠে আসছে। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি ও রাশিয়ার বাড়তে থাকা হুমকি ডেনমার্ককে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনেও এই ইস্যু নীরবে চাপ তৈরি করছে।

আর্কটিকের সম্পদ ও ভবিষ্যৎ পথ
গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরভাগ বরফে ঢাকা হলেও উপকূলীয় এলাকায় খনিজ উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্পদ ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার অর্থনৈতিক ভিত্তি হতে পারে। ফলে ডেনমার্ক আজ এমন এক ভূখণ্ড রক্ষায় কূটনৈতিক শক্তি খরচ করছে, যে ভূখণ্ডের শেষ সিদ্ধান্ত নেবে সেখানকার মানুষই।