ইউরোপের সরকারগুলো এক অভূতপূর্ব ঋণ সংগ্রহের বছরে ঢুকেছে। নতুন বছর জুড়ে ইউরোজোনের দেশগুলো বিপুল পরিমাণ সরকারি ঋণ বাজারে তুলছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় মুদ্রানীতির কড়াকড়িতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বন্ডের মজুত কমাতে শুরু করেছে। এই দুই প্রবণতা মিলিয়ে বাজারে এমন এক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের বড় ক্রেতারা হঠাৎ করেই সরে দাঁড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় আঘাত আসছে নেদারল্যান্ডসের পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার থেকে।
ইউরোজোনের ঋণ জোগাড়ের কঠিন বছর
চলতি বছরে ইউরোজোনের দেশগুলো যে পরিমাণ সরকারি বন্ড ছাড়ছে, তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পরিপক্ব হয়ে যাওয়া বন্ড বাদ দিয়েও নতুন ক্রেতা দরকার হবে বিশাল অঙ্কের। অথচ বাজারে যাদের হাতে সবচেয়ে গভীর পকেট ছিল, সেই পেনশন তহবিলগুলোই এখন ক্রমে চেকবই বন্ধ করছে। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে তাদের অংশীদারত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য, আর তার বড় অংশই ছিল ডাচ পেনশন ব্যবস্থার হাতে।
ডাচ পেনশনের কাঠামোগত বদল
নেদারল্যান্ডসে পেনশন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার শুরু হয়েছে। এতদিন অবসরপ্রাপ্তদের নির্দিষ্ট আয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হতো। সেই ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড ছিল আদর্শ বিনিয়োগ, কারণ ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট দায় মেটাতে নিশ্চিত আয় দরকার ছিল। নতুন নিয়মে এই কাঠামো বদলে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট আয়ের বদলে এখন অবসর আয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে বিনিয়োগের ফলাফলের ওপর। ইতোমধ্যে পেনশন সম্পদের বড় অংশ এই নতুন ব্যবস্থায় চলে গেছে, আর সামনের বছরগুলোতে প্রায় সব তহবিলই এতে রূপান্তরিত হবে।

বন্ডের প্রতি আগ্রহ কমার কারণ
নতুন ব্যবস্থায় পেনশন তহবিলের আর দীর্ঘমেয়াদি নির্দিষ্ট দায় নেই। ফলে বহু বছর পর নিশ্চিত অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বন্ড তাদের কাছে আগের মতো আকর্ষণীয় নয়। বরং শেয়ারসহ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ করলে বেশি মুনাফার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যদিও আয়ের ওঠানামা থাকবে। এই বাস্তবতায় ডাচ পেনশন তহবিলগুলো দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড ও সুদ অদলবদল চুক্তি ধীরে ধীরে বিক্রি করছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, খুব দীর্ঘ মেয়াদের বন্ডে তাদের বিনিয়োগ কমতে পারে বিপুল অঙ্কে।
সুদের হার ও সরকারের ঝুঁকি
বন্ডের দাম ও সুদের হার পরস্পরের বিপরীত দিকে চলে। বড় আকারে বিক্রি শুরু হলে সুদের হার বাড়বে, এমনটাই স্বাভাবিক। বাজারের কিছু অংশ ইতোমধ্যে এই চাপ হিসাবের মধ্যে নিয়েছে, তবে পরবর্তী দুই বছরে চাপ আরও বাড়তে পারে। নতুন বড় কোনো স্থায়ী ক্রেতা না এলে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে চাহিদা দুর্বলই থাকবে। সুদের হার বাড়লে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ বাড়বে, যা কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
স্বল্পমেয়াদি ঋণের ফাঁদ
এই পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীরা স্বল্পমেয়াদি বন্ড ছাড়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন, কারণ এতে সুদের হার তুলনামূলক কম। কিন্তু এতে অন্য ঝুঁকি তৈরি হয়। স্বল্পমেয়াদি ঋণ দ্রুত পুনঃঅর্থায়ন করতে হয়, ফলে হঠাৎ মুদ্রাস্ফীতি বা নীতিগত পরিবর্তনে সুদের হার বেড়ে গেলে চাপ আরও তীব্র হয়। পাশাপাশি উচ্চ সুদের লোভে যারা বন্ড কিনবে, তারা দ্রুত সরে যাওয়ার প্রবণতাও দেখাতে পারে। এতে বাজারে অস্থিরতা বাড়বে।
স্থিতিশীল ক্রেতার অভাব
আগের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট আয়ের পেনশন তহবিলগুলো ছিল এমন ক্রেতা, যারা বন্ডের দাম ওঠানামা নিয়ে খুব একটা ভাবত না। তাদের কাছে কুপন আর মূলধনই ছিল মুখ্য। এখন সেই মূল্যহীন ক্রেতারা বিরল হয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাদের বন্ডের ঝুলি হালকা করছে। তাদের জায়গা নিচ্ছে বেশি দামসংবেদনশীল বিনিয়োগকারী, যারা সুযোগ দেখলেই ঢোকে, আবার লাভের বিকল্প দেখলে দ্রুত বেরিয়ে যায়। ফলে ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে কঠিন এক বছর অপেক্ষা করছে।
Sarakhon Report 


















