একটি কল্পবিজ্ঞান ধারাবাহিকের অদ্ভুত জগৎ দেখে যদি বাস্তব অর্থনীতি আরও অদ্ভুত বলে মনে হয়, তবে সেটাই স্বাভাবিক। প্লুরিবাস নামের সেই কাহিনি আমাদের সামনে এমন এক সমাজের ছবি তুলে ধরে, যেখানে মানুষ আর মিথ্যা বলতে পারে না, গোপনীয়তা নেই, নেই প্রতিযোগিতা, নেই ব্যক্তিগত স্বার্থ। তবু এই অদ্ভুত সমষ্টির ভেতরেই লুকিয়ে আছে আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির বহু পরিচিত ধারণা।
সত্য বলার পৃথিবী ও একাকী স্বাধীনতা
গল্পের নায়িকা ক্যারল স্টার্কা একজন ক্লান্ত, হতাশ লেখক। ভিনগ্রহের এক ভাইরাস মানুষের মন জুড়ে দিয়ে সবাইকে এক যৌথ চেতনায় মিলিয়ে দেয়। মাত্র কয়েকজন এই সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকে, ক্যারল তাদের একজন। এই যৌথ চেতনায় যুক্ত মানুষ একে অন্যের ভাবনা জানে, অনুভূতি ভাগ করে নেয়, প্রতারণা করতে পারে না। ফলে ক্যারলের সামনে খুলে যায় অস্বস্তিকর এক সুযোগ—যে প্রশ্নের উত্তরে সত্য ছাড়া কিছু নেই।
কিন্তু ক্যারল স্বস্তিতে নেই। তিনি নিজেকে স্বাধীন মানুষ ভাবেন। নিজের বাজার নিজে করতে চান। অথচ দেখেন তাঁর পরিচিত দোকান ফাঁকা, কারণ সমষ্টিগত ব্যবস্থায় দোকানের আর প্রয়োজন নেই। তাঁর স্বাধীনতার দাবি পূরণ করতে পুরো একটি বাজার আবার সচল করতে হয়। এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় দৈনন্দিন জীবনের আড়ালে থাকা জটিল অর্থনৈতিক সমন্বয়, যা আমরা প্রায়ই চোখে দেখি না।
সমষ্টির দক্ষতা ও অদৃশ্য শ্রম
এই যৌথ সমাজে চুক্তি নেই, পরিচয় যাচাই নেই, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা নেই। সবাই কাজ করে সক্ষমতা অনুযায়ী এবং পায় প্রয়োজন অনুযায়ী। একে অন্যের মনের কথা জানার ফলে কাজ চলে নিখুঁত সমন্বয়ে। একজনের দক্ষতা মুহূর্তে আরেকজনের হয়ে যায়। যে কখনো খেলেনি, সেও সেরা খেলোয়াড়ের মতো খেলতে পারে। যে একদিন রেস্তোরাঁয় কাজ করত, পরদিন সে অনায়াসে বিমান চালায়।
এই ব্যবস্থায় অপচয় নেই, দ্বন্দ্ব নেই, ভুল কম। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে বড় সীমাবদ্ধতা।

প্রতিযোগিতা ছাড়া অগ্রগতির সংকট
সমষ্টিগত জ্ঞানের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও এখানে নেই সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নেই ভিন্ন পথে হাঁটার জেদ, নেই ঝুঁকি নেওয়ার ব্যক্তিগত সাহস। অথচ ইতিহাস বলছে, অর্থনীতি এগোয় সেইসব মানুষদের হাত ধরে, যারা সমষ্টির বুদ্ধিকে অগ্রাহ্য করেও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকে। ভুল করে শেখে, বারবার চেষ্টা করে, শেষ পর্যন্ত নতুন পথ খুলে দেয়।
এই সমাজে পরীক্ষা আছে, কিন্তু উন্মাদ একাগ্রতা নেই। তাই অগ্রগতিও সীমিত।
পাঠ্যবইয়ের অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি
এই কাহিনি অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। বহু সামষ্টিক মডেলে পুরো সমাজকে এক জনের মতো ধরে নেওয়া হয়। এতে হিসাব সহজ হয়, কিন্তু বাস্তব মানুষের বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়। ভিন্নতা বাদ দিলে সমীকরণ পরিষ্কার হয়, কিন্তু বাস্তবতা ঝাপসা হয়ে পড়ে।
ক্যারলের মতোই, এই আরামদায়ক সরলতা শেষ পর্যন্ত ভ্রম। ব্যক্তি যদি নিজে থাকতে না পারে, তবে সমষ্টির আরাম অর্থহীন হয়ে ওঠে। সমষ্টিকে বুঝতে হলে আবার ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনতে হয়। একে হারাতে চাইলে, আগে আলাদা হতে হয়।
আয়নায় দেখা বাস্তবতা
প্লুরিবাস তাই কেবল কল্পবিজ্ঞান নয়। এটি আমাদের অর্থনীতির এক আয়না, যেখানে সমষ্টির শক্তি যেমন দেখা যায়, তেমনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অপরিহার্যতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















