নিজের ঘরে থাকা মানুষের গভীর আবেগ—এই কথাই একসময় বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভার। ভাড়ার রসিদ নিয়ে কেউ গান বাঁধে না, এমন কথাও ইতিহাসে রয়ে গেছে। কিন্তু সময় বদলেছে। বিশ্বজুড়ে সুদের হার যেভাবে আচরণ করছে, তাতে এখন ভাড়াবাস নিয়েই নতুন করে গান লেখার সময় এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে উন্নত দেশগুলোতে বাড়ি কেনা আর ভাড়া নেওয়ার হিসাব ছিল প্রায় সমান। কিন্তু দুই হাজার বাইশ সালের পর সুদের হার দ্রুত বাড়তে শুরু করলে সেই সমীকরণ উল্টে যায়। অনেক দেশে বাড়ির দাম স্থবির কিংবা নিম্নমুখী, কিছু জায়গায় দাম কমেছেও। সুদের হার কিছুটা কমলেও বাস্তব চিত্র বলছে, ভাড়াটিয়াদের সুবিধা এখনো অটুট।
ভাড়া বনাম কেনার ব্যয়চিত্র
সম্পত্তি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অতিমাত্রায় কম সুদের সময়কালে বাড়ি কেনা তুলনামূলক সস্তা ছিল। কর, বিমা, রক্ষণাবেক্ষণ আর অগ্রিম অর্থ ধরেও মাসিক ব্যয় ভাড়ার চেয়ে কম পড়ত। কিন্তু সেই সময় শেষ। এখন নতুন ক্রেতাকে মাসে গড়ে কয়েকশ ডলার বেশি খরচ করতে হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে এই পার্থক্য আরও ভয়াবহ।
এই প্রবণতা কেবল এক দেশের নয়। অস্ট্রেলিয়ার বড় শহরগুলোতে এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে ফ্ল্যাট কেনা ভাড়ার চেয়ে সস্তা। ব্রিটেনেও ভাড়ার আয় আর ঋণের সুদের ব্যবধান খুব বেশি নয়। বাড়িওয়ালাদের রক্ষণাবেক্ষণ আর করের চাপ ধরলে বোঝা যায়, ভাড়াটিয়ারা তুলনামূলক ভালো অবস্থানেই আছেন।
বাড়ি মানেই বিনিয়োগ—এই ধারণা কতটা ঠিক
ভাড়াটিয়ারা প্রায়ই ভাবেন, ভাড়া দিয়ে তারা টাকা নষ্ট করছেন, আর বাড়ির মালিকেরা সম্পদ গড়ে তুলছেন। কিন্তু বাড়ি একমাত্র বিনিয়োগ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময়জুড়ে বাড়ির দাম বাড়লেও এবং সুদের হার কমলেও কিছু শহরে ভাড়া নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ শেয়ারবাজার বা করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ করলে লাভ বেশি হতো। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে বাড়ি কেনাই সেরা সিদ্ধান্ত নয়।
কিছু বাজারে ব্যতিক্রম
হংকংয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাড়ার আয় বেড়েছে। কারণ সেখানে বাড়ির দাম বাস্তবে অনেকটা নেমে গেছে। তবে হংকংয়ের ঋণব্যবস্থা আলাদা। সেখানে অধিকাংশ ঋণ ভাসমান সুদের ওপর নির্ভরশীল, যা স্বল্পমেয়াদি সুদের সঙ্গে ওঠানামা করে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সুদের প্রভাব বেশি, আর সেগুলো সাম্প্রতিক কমতির পরও আগের তুলনায় বেশ উঁচুতেই আছে।
দীর্ঘমেয়াদি সুদের ভবিষ্যৎ
ভাড়া আর কেনার লড়াইয়ের ফল নির্ভর করছে দীর্ঘমেয়াদি সুদের গতিপথের ওপর। সরকারি ঋণের চাপ আর মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী আশঙ্কা সুদের হারকে আঠার মতো আটকে রাখতে পারে। ফলে বাড়ি কেনার ব্যয় সহজে কমবে—এমন আশা আপাতত দুর্বল।
নীতিনির্ধারণে ভাড়াটিয়াদের সুবিধা
পশ্চিমা দেশগুলোতে ভাড়াটিয়াবান্ধব আইন বাড়ছে। ভাড়া বাড়ানো ও উচ্ছেদ কঠিন হচ্ছে। কিছু শহরে ভাড়া স্থির করে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারী হিসেবে বাড়ির মালিকদের নিরুৎসাহিত করছে এবং ভাড়াটিয়াদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
আবেগ বনাম হিসাব
নিজের বাড়ির প্রতি আবেগ, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা কিংবা ব্যবহারিক প্রয়োজন অনেককে কেনার দিকে টানে। বড় পরিবারের জন্য ভাড়ার ঘর পাওয়া কঠিন—এটাও বাস্তবতা। তবে ঠান্ডা মাথায় কেবল হিসাব কষলে ফল স্পষ্ট। বাড়ির দাম বড় আকারে না কমলে, দীর্ঘমেয়াদি সুদ নাটকীয়ভাবে না নামলে কিংবা ভাড়া হঠাৎ আকাশছোঁয়া না হলে, ভাড়া নেওয়াই থাকবে লাভজনক পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















