০৪:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা: হৃদরোগ থেকে মেনোপজ পর্যন্ত যে সত্যগুলো জানা জরুরি বিচ্ছেদের সবচেয়ে কঠিন সত্য জানালেন জেনিফার গার্নার বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ২০২৬ সালের ইতিবাচক সূচনা ইরানে বিক্ষোভে গুলি, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন আরও তীব্র আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় তীব্র বোমাবর্ষণ, তিন দিনে নিহত অন্তত সতেরো গত ১৬ মাসে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার আমি: আসিফ নজরুল ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো সহজ নয়: অর্থ উপদেষ্টা গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে যুক্ত হতে আগ্রহ জানাল বাংলাদেশ ‘আওয়ামীপন্থী’ শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর অফিসে নিলেন চাকসু নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ

১০ জানুয়ারি: বাংলার আকাশে বাতাসে বেজেছিল, “ওই মহামানব আসে”

আজ বাংলাদেশের স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিজয়ী নেতা হিসেবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।

এ বছর এ দিবস বাংলাদেশে পালিত হবে না। বরং তার বদলে এ দিবসে যদি কেউ শাবল হাতে আবার তাঁর ঐতিহাসিক বাড়িটির আরও কিছু ইট ভাঙতে যায় তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বরং সেটাই স্বাভাবিক।

আবার এই ২০২৬ সালে দেশের ছাত্রছাত্রীরা যখন নতুন বই হাতে পাবে তারা সে বইয়ে দেখতে পাবে শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ, শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ নেই। এখানেই শেষ নয়, তারা এটাও দেখতে পাবে ওই সব বইয়ে ২৬ মার্চ ১৯৭১ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এমন একটি অসত্য তথ্য।

বাংলাদেশে এই ঘটনা নতুন নয়। মাঝে মাঝেই ঘটে। তবে সত্য বলতে গেলে বাঙালির জাতীয় চরিত্র যারা বোঝেন, তাদের এ নিয়ে কোন কষ্ট বা দুঃখ থাকা উচিত নয়। এমনকি এটাই স্বাভাবিক ধরা উচিত। কারণ, যতই সমগ্র জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে, চূড়ান্ত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন করেন না কেন, বাঙালি জাতির কাছ থেকে এটাই তাঁর প্রাপ্য।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস মঙ্গলবার

বাংলা ১৩০২ সালে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির চরিত্র বোঝাতে গিয়ে

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায়, মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন”।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও স্রষ্টা তেমনি বাঙালি জাতিকে মানুষ করার জন্য একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার সৌভাগ্য সৃষ্টি করে দেওয়ার ভার দিয়েছিলেন।

বাঙালি জাতি ও তার চরিত্র এবং বিদ্যাসাগরের অবস্থান ও প্রাপ্তি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন। “তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন।”

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনি এ জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র ও স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক তৈরি করে দিয়ে তার বদলে কৃতঘ্নতা পেয়েছেন।

তবে এই কৃতঘ্নতার স্বভাবের মধ্যে বড় হওয়া বাঙালি জাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের “এক সুগভীর ধিক্কার ছিল”। অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ভালোভাবে এই জাতির চরিত্র জানতেন। যা তিনি এক কথায় বলে গেছেন, “‘পরশ্রীকাতর’ শব্দটি বাংলা ভাষায় ছাড়া অন্য কোন ভাষায় নেই”।

বাঙালি জাতির চরিত্র সম্পর্কে মাত্র একটি শব্দ দিয়ে এতটা পরিপূর্ণভাবে আর কেউ প্রকাশ করতে পারেননি। তারপরেও এই জাতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর কোন অভিযোগ ছিল না। বরং পিতার মতো হৃদয় নিয়ে তিনি তাদের মানুষ করবার জন্য ভালোবেসে গেছেন সপরিবারে তার জাতির মানুষের কাছে নিহত হওয়ার পূর্ব অবধি।

এবং তার জাতিতে যে বাংলাদেশে গণহত্যাকারী ইয়াহিয়া খানের থেকেও নিম্নমানের মানুষ আছে তা জানা সত্ত্বেও। ইয়াহিয়া খান তাঁকে হত্যা করেননি। ইয়াহিয়ার লোকেরা তার বাড়ি ভাঙেনি। তাঁর জাতির মানুষ তাঁকে হত্যা করে জানাজা পর্যন্ত হতে দেয়নি। আর তাঁর জাতির সন্তানের ক্ষমতাকালে তার ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙা হয়েছে অশ্লীলভাবে।

আজ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ...

তবে এ কাজ যারা করেছে তারাও পরোক্ষভাবে ভাগ্যবান। কারণ, যার আমলে ও যার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও তার বাড়ি ভাঙা হয়েছিল—তারা অন্তত বঙ্গবন্ধু নামক পৃথিবীর এই পরশমনিকে স্পর্শ করার কারণে নেতিবাচকভাবে হলেও ইতিহাসে স্থান পাবেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও বাড়িভাঙার কারিগর হিসেবে ইতিহাসে তাদের নাম থাকবেই।

তবে ইতিহাস তার নির্মম পাতায় যাই লিখে রাখুক না কেন। মানব সভ্যতার ও পশ্চাৎপদ জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্থান যত ঊর্ধ্বে থাকুক না কেন—এই বঙ্গ সমাজে তিনি কত হাজার বছর পরে যে মূল্যায়িত হবেন তা বলা সত্যই দুরূহ।

কারণ, যে সমাজে শোভন বাক্যের থেকে অশোভন বাক্যের মূল্য বেশি, সত্য থেকে মিথ্যার মূল্য বেশি, ভালো কাজের থেকে খারাপ কাজের মূল্য বেশি, জ্ঞানের থেকে অজ্ঞতার মূল্য বেশি, বুদ্ধির থেকে শঠতার মূল্য বেশি, সভ্যদের মস্তিষ্ক শক্তির চেয়ে অসভ্যতার পেশি শক্তির মূল্য বেশি, ভালোবাসার থেকে হৃদয়হীনতার মূল্য বেশি, সত্য বলার থেকে বাকচাতুর্যের মূল্য বেশি, সর্বোপরি নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসার থেকে ভিন্নদেশি অর্থের দাস হওয়া বেশি যোগ্যতা বলে গণ্য হয়—সে দেশে, সে সমাজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়ন হওয়া সম্ভব নয়। তাকে স্মরণ না করে তাকে ক্ষুদ্র ও খণ্ডতার মধ্যে আনাই এখানে সহজাত।

রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মানুষ ও বিদ্যাসাগরের অবস্থান সম্পর্কে লিখেছেন, “বৃহৎ বনস্পতি যেমন ক্ষুদ্র বনজঙ্গল পরিবেষ্টন হইতে ক্রমেই শূন্য আকাশে মস্তক তুলিয়া উঠে বিদ্যাসাগর সেইরূপ বয়বৃদ্ধি সহকারে বঙ্গসমাজের সমস্ত ক্ষুদ্রতাজাল হইতে ক্রমশই শব্দহীন সুদূর নির্জনে উত্থান করিয়াছিলেন, সেখান হইতে তিনি তাপিতকে ছায়া এবং ক্ষুধিতকে ফল দান করিতেন।”

যদি না আসত অমন দানব ভোর - Toronto Bangla Town | Digital Bangla Weekly Magazine

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সাধারণ বাঙালির পার্থক্য এখানেই—তিনি সুদূর আকাশে উঁচু মস্তক তোলা এক মানুষ যিনি ভুলক্রমে বাঙালি হিসেবে, এই বাঙালি নামক ক্ষুদ্র বনজঙ্গলে জন্ম নিয়ে—“এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক ও তার্কিক জাতিকে”, মাথার ওপর ছায়া ও ফল দান করেছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে দিয়ে।

আগাছা দীর্ঘ বিবর্তনের ভেতর দিয়েই একদিন বনস্পতিকে বা দীর্ঘকায় মাথা উঁচু গাছকে চেনার মতো বৃক্ষে পরিণত হয়। কোন স্বল্প সময়ে তা সম্ভব নয়। বরং আগাছার চরিত্রই থাকে বনস্পতির গায়ে ময়লা সৃষ্টি করে নিজেরা আগাছা হিসেবেই জড়াজড়ি করে একটি জঙ্গল তৈরি করে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা।

তাই দীর্ঘকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খর্বাকৃতি বাঙালির হাতে বুলেট উপহার পেয়েছেন। তাপিতকে ছায়া দেওয়ার হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু হৃদয়হীন বাঙালির কাছে ভালোবাসার বদলে নির্মমতা পেয়েছেন। আর হৃদয়বান সব সময়ই শঠের কাছে অপরিচিত থাকে তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কীর্তি ধ্বংসের চেষ্টা শুধু নয়, তার আকার ও চরিত্র থেকে বাঙালি বার বার সরে আসার চেষ্টা করে। কারণ, তার মতো সততার, মহত্বের ও সর্বোপরি নিজহাতে সৃষ্টি করার গুণের অধিকারী মানুষের সঙ্গে সাধারণ এই আগাছা বাঙালির চরিত্র মেলে না।

তার বদলে, খর্বাকৃতি এই জাতি তার নিজ আকৃতির সমান শারীরিকভাবে খর্বাকৃতি, শঠ, অজ্ঞ, হৃদয়হীন, আকণ্ঠ দুষ্কর্মে নিমজ্জিতকেই তাদের নেতা মানতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।

আর এ সব জেনেও নিজ জাতি হিসেবে আপন হৃদয়ে গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই জাতিকেই ভালোবেসে তার সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ

দরিদ্র এই আগাছাতুল্য জাতিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বার বার ফাঁসির রজ্জুকে মোকাবিলা করেছিলেন। এমনকি পরশ পাথর হয়ে এই জাতির ভেতর দিয়েই তিনি একটি মুক্তিকামী মানবগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। যারা তাঁর নেতৃত্বেই, তাঁর সাহসে বলীয়ান হয়ে যুদ্ধ করেছিল আপন দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে। সফলও হয়েছিল। আর সেই সফলতার চূড়ান্ত মুহূর্তে আরেক মানবী রেখেছিলেন তার অভয়দাত্রী হাত—যিনি আজন্ম সাহসী ইন্দিরা গান্ধী।

বঙ্গবন্ধু সৃষ্ট বাঙালির এই ইতিহাসই বাঙালির হাজার বছরের একমাত্র অর্জন। আর সে অর্জন শেষে ফাঁসির রায় পাওয়া, পেছনে খুঁড়ে রাখা কবরকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ পৃথিবী কাঁপিয়ে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তিনি শুধু নিজ সৃষ্ট স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেননি এদিন, ক্ষুদ্রকায় এ বাঙালি জাতিকেও তিনি তাঁর মাপে দৈর্ঘ্য দিয়েছিলেন। তাই ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ শুধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দিন নয়, এ দিনটি মূলত বঙ্গবন্ধুর জীবনে লভিয়া নিজ জীবন বাঙালির আগাছা থেকে বৃক্ষ হওয়ার পথে যাত্রার দিন।

এ কারণে যখন জাতি এ দিনটি পালন করে না তখন এটাই প্রমাণিত হয় বাঙালি নিজেকে আরও বেশি আগাছাতে রূপান্তরিত করার পথে এগিয়ে চলেছে।

 

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারণা: হৃদরোগ থেকে মেনোপজ পর্যন্ত যে সত্যগুলো জানা জরুরি

১০ জানুয়ারি: বাংলার আকাশে বাতাসে বেজেছিল, “ওই মহামানব আসে”

১১:১৬:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

আজ বাংলাদেশের স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিজয়ী নেতা হিসেবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।

এ বছর এ দিবস বাংলাদেশে পালিত হবে না। বরং তার বদলে এ দিবসে যদি কেউ শাবল হাতে আবার তাঁর ঐতিহাসিক বাড়িটির আরও কিছু ইট ভাঙতে যায় তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বরং সেটাই স্বাভাবিক।

আবার এই ২০২৬ সালে দেশের ছাত্রছাত্রীরা যখন নতুন বই হাতে পাবে তারা সে বইয়ে দেখতে পাবে শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ, শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ নেই। এখানেই শেষ নয়, তারা এটাও দেখতে পাবে ওই সব বইয়ে ২৬ মার্চ ১৯৭১ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এমন একটি অসত্য তথ্য।

বাংলাদেশে এই ঘটনা নতুন নয়। মাঝে মাঝেই ঘটে। তবে সত্য বলতে গেলে বাঙালির জাতীয় চরিত্র যারা বোঝেন, তাদের এ নিয়ে কোন কষ্ট বা দুঃখ থাকা উচিত নয়। এমনকি এটাই স্বাভাবিক ধরা উচিত। কারণ, যতই সমগ্র জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে, চূড়ান্ত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন করেন না কেন, বাঙালি জাতির কাছ থেকে এটাই তাঁর প্রাপ্য।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস মঙ্গলবার

বাংলা ১৩০২ সালে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির চরিত্র বোঝাতে গিয়ে

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায়, মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন”।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও স্রষ্টা তেমনি বাঙালি জাতিকে মানুষ করার জন্য একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার সৌভাগ্য সৃষ্টি করে দেওয়ার ভার দিয়েছিলেন।

বাঙালি জাতি ও তার চরিত্র এবং বিদ্যাসাগরের অবস্থান ও প্রাপ্তি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন। “তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন।”

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনি এ জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র ও স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক তৈরি করে দিয়ে তার বদলে কৃতঘ্নতা পেয়েছেন।

তবে এই কৃতঘ্নতার স্বভাবের মধ্যে বড় হওয়া বাঙালি জাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের “এক সুগভীর ধিক্কার ছিল”। অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ভালোভাবে এই জাতির চরিত্র জানতেন। যা তিনি এক কথায় বলে গেছেন, “‘পরশ্রীকাতর’ শব্দটি বাংলা ভাষায় ছাড়া অন্য কোন ভাষায় নেই”।

বাঙালি জাতির চরিত্র সম্পর্কে মাত্র একটি শব্দ দিয়ে এতটা পরিপূর্ণভাবে আর কেউ প্রকাশ করতে পারেননি। তারপরেও এই জাতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর কোন অভিযোগ ছিল না। বরং পিতার মতো হৃদয় নিয়ে তিনি তাদের মানুষ করবার জন্য ভালোবেসে গেছেন সপরিবারে তার জাতির মানুষের কাছে নিহত হওয়ার পূর্ব অবধি।

এবং তার জাতিতে যে বাংলাদেশে গণহত্যাকারী ইয়াহিয়া খানের থেকেও নিম্নমানের মানুষ আছে তা জানা সত্ত্বেও। ইয়াহিয়া খান তাঁকে হত্যা করেননি। ইয়াহিয়ার লোকেরা তার বাড়ি ভাঙেনি। তাঁর জাতির মানুষ তাঁকে হত্যা করে জানাজা পর্যন্ত হতে দেয়নি। আর তাঁর জাতির সন্তানের ক্ষমতাকালে তার ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙা হয়েছে অশ্লীলভাবে।

আজ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ...

তবে এ কাজ যারা করেছে তারাও পরোক্ষভাবে ভাগ্যবান। কারণ, যার আমলে ও যার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও তার বাড়ি ভাঙা হয়েছিল—তারা অন্তত বঙ্গবন্ধু নামক পৃথিবীর এই পরশমনিকে স্পর্শ করার কারণে নেতিবাচকভাবে হলেও ইতিহাসে স্থান পাবেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও বাড়িভাঙার কারিগর হিসেবে ইতিহাসে তাদের নাম থাকবেই।

তবে ইতিহাস তার নির্মম পাতায় যাই লিখে রাখুক না কেন। মানব সভ্যতার ও পশ্চাৎপদ জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্থান যত ঊর্ধ্বে থাকুক না কেন—এই বঙ্গ সমাজে তিনি কত হাজার বছর পরে যে মূল্যায়িত হবেন তা বলা সত্যই দুরূহ।

কারণ, যে সমাজে শোভন বাক্যের থেকে অশোভন বাক্যের মূল্য বেশি, সত্য থেকে মিথ্যার মূল্য বেশি, ভালো কাজের থেকে খারাপ কাজের মূল্য বেশি, জ্ঞানের থেকে অজ্ঞতার মূল্য বেশি, বুদ্ধির থেকে শঠতার মূল্য বেশি, সভ্যদের মস্তিষ্ক শক্তির চেয়ে অসভ্যতার পেশি শক্তির মূল্য বেশি, ভালোবাসার থেকে হৃদয়হীনতার মূল্য বেশি, সত্য বলার থেকে বাকচাতুর্যের মূল্য বেশি, সর্বোপরি নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসার থেকে ভিন্নদেশি অর্থের দাস হওয়া বেশি যোগ্যতা বলে গণ্য হয়—সে দেশে, সে সমাজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়ন হওয়া সম্ভব নয়। তাকে স্মরণ না করে তাকে ক্ষুদ্র ও খণ্ডতার মধ্যে আনাই এখানে সহজাত।

রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মানুষ ও বিদ্যাসাগরের অবস্থান সম্পর্কে লিখেছেন, “বৃহৎ বনস্পতি যেমন ক্ষুদ্র বনজঙ্গল পরিবেষ্টন হইতে ক্রমেই শূন্য আকাশে মস্তক তুলিয়া উঠে বিদ্যাসাগর সেইরূপ বয়বৃদ্ধি সহকারে বঙ্গসমাজের সমস্ত ক্ষুদ্রতাজাল হইতে ক্রমশই শব্দহীন সুদূর নির্জনে উত্থান করিয়াছিলেন, সেখান হইতে তিনি তাপিতকে ছায়া এবং ক্ষুধিতকে ফল দান করিতেন।”

যদি না আসত অমন দানব ভোর - Toronto Bangla Town | Digital Bangla Weekly Magazine

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সাধারণ বাঙালির পার্থক্য এখানেই—তিনি সুদূর আকাশে উঁচু মস্তক তোলা এক মানুষ যিনি ভুলক্রমে বাঙালি হিসেবে, এই বাঙালি নামক ক্ষুদ্র বনজঙ্গলে জন্ম নিয়ে—“এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক ও তার্কিক জাতিকে”, মাথার ওপর ছায়া ও ফল দান করেছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে দিয়ে।

আগাছা দীর্ঘ বিবর্তনের ভেতর দিয়েই একদিন বনস্পতিকে বা দীর্ঘকায় মাথা উঁচু গাছকে চেনার মতো বৃক্ষে পরিণত হয়। কোন স্বল্প সময়ে তা সম্ভব নয়। বরং আগাছার চরিত্রই থাকে বনস্পতির গায়ে ময়লা সৃষ্টি করে নিজেরা আগাছা হিসেবেই জড়াজড়ি করে একটি জঙ্গল তৈরি করে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা।

তাই দীর্ঘকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খর্বাকৃতি বাঙালির হাতে বুলেট উপহার পেয়েছেন। তাপিতকে ছায়া দেওয়ার হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু হৃদয়হীন বাঙালির কাছে ভালোবাসার বদলে নির্মমতা পেয়েছেন। আর হৃদয়বান সব সময়ই শঠের কাছে অপরিচিত থাকে তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কীর্তি ধ্বংসের চেষ্টা শুধু নয়, তার আকার ও চরিত্র থেকে বাঙালি বার বার সরে আসার চেষ্টা করে। কারণ, তার মতো সততার, মহত্বের ও সর্বোপরি নিজহাতে সৃষ্টি করার গুণের অধিকারী মানুষের সঙ্গে সাধারণ এই আগাছা বাঙালির চরিত্র মেলে না।

তার বদলে, খর্বাকৃতি এই জাতি তার নিজ আকৃতির সমান শারীরিকভাবে খর্বাকৃতি, শঠ, অজ্ঞ, হৃদয়হীন, আকণ্ঠ দুষ্কর্মে নিমজ্জিতকেই তাদের নেতা মানতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।

আর এ সব জেনেও নিজ জাতি হিসেবে আপন হৃদয়ে গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই জাতিকেই ভালোবেসে তার সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ

দরিদ্র এই আগাছাতুল্য জাতিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বার বার ফাঁসির রজ্জুকে মোকাবিলা করেছিলেন। এমনকি পরশ পাথর হয়ে এই জাতির ভেতর দিয়েই তিনি একটি মুক্তিকামী মানবগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। যারা তাঁর নেতৃত্বেই, তাঁর সাহসে বলীয়ান হয়ে যুদ্ধ করেছিল আপন দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে। সফলও হয়েছিল। আর সেই সফলতার চূড়ান্ত মুহূর্তে আরেক মানবী রেখেছিলেন তার অভয়দাত্রী হাত—যিনি আজন্ম সাহসী ইন্দিরা গান্ধী।

বঙ্গবন্ধু সৃষ্ট বাঙালির এই ইতিহাসই বাঙালির হাজার বছরের একমাত্র অর্জন। আর সে অর্জন শেষে ফাঁসির রায় পাওয়া, পেছনে খুঁড়ে রাখা কবরকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ পৃথিবী কাঁপিয়ে স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তিনি শুধু নিজ সৃষ্ট স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেননি এদিন, ক্ষুদ্রকায় এ বাঙালি জাতিকেও তিনি তাঁর মাপে দৈর্ঘ্য দিয়েছিলেন। তাই ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ শুধু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দিন নয়, এ দিনটি মূলত বঙ্গবন্ধুর জীবনে লভিয়া নিজ জীবন বাঙালির আগাছা থেকে বৃক্ষ হওয়ার পথে যাত্রার দিন।

এ কারণে যখন জাতি এ দিনটি পালন করে না তখন এটাই প্রমাণিত হয় বাঙালি নিজেকে আরও বেশি আগাছাতে রূপান্তরিত করার পথে এগিয়ে চলেছে।

 

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.