গত কয়েক দশকে এশিয়া–ইউরো মহাদেশের সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততা ক্রমেই গভীর হয়েছে। এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের বারো দিনের যুদ্ধের পর। ইতিহাসের বিচারে ইরান সব সময়ই এশিয়া–ইউরো মহাদেশের অংশ ছিল, যদিও উভয়ের মধ্যকার সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।
সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় ইরান ও এই মহাদেশ একে অপরের কাছ থেকে পারস্পরিক সুফল পেয়েছে। ইরান মহাদেশের স্থিতিশীলতায় অবদান রেখেছে, আর মহাদেশটি ইরানের জন্য কৌশলগত গভীরতা হিসেবে কাজ করেছে—বিশেষত আগ্রাসন ও অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।
ভৌগোলিকভাবে এশিয়া–ইউরো মহাদেশকে অনেক সময় পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূখণ্ড হিসেবে ধরা হয়। ইউরোপীয়রা একে ইউরেশিয়া মহাদেশ বলে থাকেন, আর চীনারা একে এশিয়া–ইউরো মহাদেশ হিসেবে অভিহিত করেন। আবার সংকীর্ণ অর্থে এই মহাদেশকে চীনের পূর্ব, রাশিয়ার উত্তর এবং ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ত্রিভুজাকার অঞ্চল হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। প্রয়াত মার্কিন কৌশলবিদ জ্বিগনিউ ব্রেজিনস্কি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’-এ ইরান, রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য জোটকে ইউরো–এশীয় ভূখণ্ডে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক দুঃস্বপ্ন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

বিভিন্ন দিক থেকেই ইরান বরাবরই এই মহাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভৌগোলিকভাবে ইরানের পূর্ব, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এই মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাসে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন যাযাবর জনগোষ্ঠী এবং প্রাচীন চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল রেশমপথের মাধ্যমে। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও আজও এই মহাদেশে পারস্য ও ইরানিদের ছাপ স্পষ্ট। প্রায় ছয়শ বছর আগে চীনের মিং রাজবংশের নামের অর্থ ‘আলো’ বা ‘উজ্জ্বলতা’—যা জরথুস্ত্র ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত। মধ্য এশিয়া পেরিয়ে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলজুড়ে আজও জরথুস্ত্র ধর্মের নিদর্শন দেখা যায়।
দুঃখজনকভাবে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে পাশ্চাত্যের উত্থানের ফলে এই ঐতিহাসিক সংযোগ কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হয়ে পড়ে। শিল্পায়নের পথে প্রথম এগিয়ে যাওয়ায় পাশ্চাত্য শক্তি হয়ে ওঠে প্রভাবশালী, আর বিশ্বের বহু অঞ্চলের মতো ইরানও পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতার শিকার হয়। এর অন্যতম গুরুতর পরিণতি ছিল—ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত ইরানের ইতিহাসে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কই হয়ে ওঠে প্রধান নির্ধারক, যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইরানি জনগণ পশ্চিমাকরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
তবে গত দুই দশকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এশিয়া–ইউরো মহাদেশ এবং এখানকার প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ আবারও বাড়তে থাকে, যাকে একধরনের পুনঃসম্পৃক্ততা বলা যায়।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে, এবং বহু বছর ধরে চীন ইরানের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে অবস্থান করছে। মহাদেশের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ব্যক্তিগতভাবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দফা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে চার দফা বৈঠক করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি পাকিস্তান, কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সফরও করেছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গত দুই বছরে ইরান সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য হয়েছে—যা এশিয়া–ইউরো মহাদেশের প্রধান শক্তিগুলোর নেতৃত্বাধীন সংগঠন।

এই পুনঃসম্পৃক্ততার গুরুত্ব অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। কোনো কোনো দিক থেকে এশিয়া–ইউরো মহাদেশ ইরানের জন্য কৌশলগত গভীরতা হিসেবে কাজ করেছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকস উভয়ই ইরানের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডায় প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে ইরানের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। পারমাণবিক ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে ইরানের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা যায় ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়ে তীব্র বিতর্কে।
বিশেষ করে চীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ উপেক্ষা করে ইরান থেকে তেল আমদানিতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যদিও ইরানি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই সম্পর্কের পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তবু চীনের সমর্থন ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এশিয়া–ইউরো মহাদেশের সঙ্গে ইরানের পুনঃসম্পৃক্ততাকে ঐতিহাসিক অনিবার্যতা হিসেবেও দেখা উচিত। গত কয়েক দশকে এই মহাদেশের উত্থান স্পষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া চীনের মাধ্যমে। এই উত্থানের প্রতিফলন দেখা যায় সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্প্রসারণেও, যেখানে বর্তমানে দশটি পূর্ণ সদস্য, দুটি পর্যবেক্ষক এবং পনেরটি সংলাপ অংশীদার রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন বিশ্ব মোট উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের সমান। এই উত্থানের কারণেই মহাদেশটি অবৈধ পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে ইরানকে সমর্থন দিতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে, এবং ধৈর্য বজায় রাখলে ভবিষ্যতে মহাদেশটি ইরানের জন্য আরও বড় কৌশলগত গভীরতা হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, এশিয়া–ইউরো মহাদেশের স্থিতিশীল ব্যবস্থায় ইরানের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে ইরানের অবিচল প্রতিরোধের ফলেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্য এশিয়ায় প্রবেশ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের পর ব্রেজিনস্কির কল্পিত বৈশ্বিক সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়ার পথ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাস্তবায়িত হয়নি। এই ক্ষেত্রে ইরানের অবদান কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। ভবিষ্যতেও ইরানের শক্তিশালী হয়ে ওঠা মধ্য এশিয়া ও এশিয়া–ইউরো মহাদেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ইরানের সঙ্গে এশিয়া–ইউরো মহাদেশের সংযোগ গভীর। ইরান মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রবেশদ্বার হিসেবে অবস্থান করছে এবং মধ্য এশিয়া ও মহাদেশের কেন্দ্রে পশ্চিমা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই সংযোগ নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে, এবং এর ভূ-কৌশলগত ভূমিকা কখনোই খাটো করে দেখা উচিত নয়।
সবশেষে বলা যায়, এশিয়া–ইউরো মহাদেশের সঙ্গে ইরানের পুনঃসম্পৃক্ততা শুধু ইতিহাসে প্রত্যাবর্তন নয়, বরং মহাদেশের উত্থানের ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই প্রক্রিয়া কখনোই সহজ হবে না। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মহাদেশের প্রধান শক্তিগুলো কতটা দৃঢ় সমর্থন দিতে পারে এবং একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমন্বয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে—মহাদেশের সঙ্গে আরও গভীর সংযুক্তির বিষয়ে ইরানের ভেতরে বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং ধারাবাহিকভাবে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।
ড. জিন লিয়াংশিয়াং 



















