১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬
ইউনিক্লোর ঝলমলে বিক্রি, লাভের পূর্বাভাস বাড়াল ফাস্ট রিটেইলিং ঋণের বদলে যুদ্ধবিমান: সৌদি অর্থ সহায়তা রূপ নিতে পারে জেএফ–সতেরো চুক্তিতে গৌর নদী: বরিশালের শিরা-উপশিরায় ভর করে থাকা এক জীবন্ত স্মৃতি আমার মতো আর কারও না হোক আকুর বিল পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩২.৪৩ বিলিয়ন ডলার জ্যোতির নেতৃত্বে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দল ঘোষণা প্রবাসী আয়ে গতি আনতে নতুন নির্দেশনা, একই দিনে গ্রাহকের হিসাবে টাকা জমার আদেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালুকায় তরুণ হত্যাকাণ্ডে আরও এক অভিযুক্ত গ্রেপ্তার, ঢাকায় লুকিয়ে ছিল মূল উসকানিদাতা উত্তরে তারেকের সফর নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙছে না: সালাহউদ্দিন আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নির্বাচন ব্যাহত হবে না: সালাহউদ্দিন আহমদ

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে

  • Sarakhon Report
  • ০৮:৫৪:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • 23

বাংলাদেশের বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ তার সাম্প্রতিক পাকিস্তান সফরের সময়ে তাদের কাছ থেকে ‘জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি’ যুদ্ধ বিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানাচ্ছে দেশটির বিমান বাহিনী। এই যুদ্ধবিমানটি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ নামেও পরিচিত।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, এই যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে তারা এখনো কোনো চুক্তিতে পৌঁছাননি, তবে “তারা কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে”।

মঙ্গলবার পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবের সিধুর সাথে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের বৈঠকে এ আলোচনা হয়েছে।

এসময় পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধান বাংলাদেশকে সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহ এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন।

“বৈঠকে সম্ভাব্য জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে,” পাকিস্তান আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

এই যুদ্ধবিমানটি ৪.৫ প্রজন্মের একটি মাল্টি রোল যুদ্ধবিমান যা শক্তিশালী রাডার ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত। এটি বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ মিশনে অংশ নিতে সক্ষম।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সহায়তায় পাকিস্তান এই যুদ্ধ বিমান তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। হালকা ওজনের এই যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা ২০১৯ সালে ও ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের সাথে পাকিস্তানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সময়ে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

পাকিস্তান ইতোমধ্যে সম্ভবত আজারবাইজার, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে। এছাড়া ইরাক ও লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের সাথে এই বিমান বিক্রি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশ সরকার বা বিমান বাহিনীর দিক থেকে এখনো এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য আসেনি।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান

বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে

বাংলাদেশের এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে গিয়ে দেশটির বিমান বাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

পরে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বৈঠকে কার্যকর সহযোগিতা জোরদার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মহাকাশ খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়”।

“বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কার্যকর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং যুদ্ধে তাদের সাফল্য রেকর্ডের প্রশংসা করেন”।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে বেসিক অ্যাডভান্সড ফ্লাইং থেকে শুরু করে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষায়িত কোর্সসহ সমন্বিত প্রশিক্ষণ সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

এই বৈঠকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান বিমান বাহিনীর পুরনো বিমানগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং আকাশ নজরদারির মান উন্নয়নের জন্য সমন্বিত এয়ার ডিফেন্স রাডার সিস্টেমের বিষয়ে সহযোগিতা পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল পাকিস্তান বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করে। এর মধ্যে আছে ন্যাশনাল আইএসআর ও ইন্টিগ্রেটেড এয়ার অপারেশন্স সেন্টার, পাকিস্তান এয়ার ফোর্স সাইবার কমান্ড এবং ন্যাশনাল অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক।

এ সময় তাদের পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মনুষ্যবিহীন কার্যক্রম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার, স্পেস ও আইএসআর বিষয়ে সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

ওই বিবৃতিতে এই সফরকে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটি প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যাতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তানে তৈরি হচ্ছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান
পাকিস্তানে তৈরি হচ্ছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান

কার কাছে বিক্রি করেছে পাকিস্তান

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিষয়ে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে।

এর প্রথম টেস্ট মডেল ডেভেলপ করা হয়েছিল ২০০৩ সালে এবং ২০১০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রথম জেএফ-১৭ তাদের বাহিনীর বিমান বহরে যোগ করে।

এরপর এমআইজি যুদ্ধবিমান তৈরি করা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান কোম্পানি মিকোয়ানও এ প্রকল্পে যুক্ত হয়।

পুরোনো মিরেজ, এফ-৭ ও এ-৫ যুদ্ধবিমানের জায়গায় নতুন বিমান আনার কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাকিস্তান বিমান বাহিনী জেএফ-১৭ থান্ডার এর নকশা করে।

এই যুদ্ধবিমানটির বিশেষত্ব হলো এটি পাকিস্তানের ভেতরেই তৈরি।

এই যুদ্ধবিমানটি তৈরির পর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশটির বিমান বাহিনীর মুখপাত্র এয়ার কমোডর আহমার রাজা বিবিসিকে বলেছিলেন যে “জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি একটি চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান”।

“ব্লক থ্রি হলো জেএফ-১৭ এর পরবর্তী ভার্সন। এখনো নতুন রাডার সংযোজন করা হয়েছে। এই ভার্সনের যুদ্ধবিমানটিতে নতুন ও আধুনিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজিত হবে। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতাও জোরদার হবে এবং প্রতিটি দিক থেকেই এটি হবে উন্নত,” বলেছিলেন তিনি।

পাকিস্তান এখন পর্যন্ত আজারবাইজান, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে।

গত বছর দেশটি প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় আজারবাইজানের কাছে ৪০টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মুখপাত্র জানাতে রাজি হননি- ঠিক কতটি যুদ্ধবিমান বিক্রি হয়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে যে ইরাক ও লিবিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।

এছাড়া ইরানসহ কয়েকটি দেশ এই যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

সবুজ মাঠের ওপর সবুজ রংয়ের একটি যুদ্ধবিমান
বাংলাদেশও এই বিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান বিমান বাহিনী

এই যুদ্ধবিমান কেনায় আগ্রহ কেন

জেএফ-১৭ আকাশে যুদ্ধের পাশাপাশি ভূমিতে শত্রুর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও হামলায় সক্ষম।

এটি আকাশ থেকে ভূমি এবং আকাশ থেকে আকাশে হামলাযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র বহনে সক্ষম।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধবিমান এফ-১৬ ফ্যালকনের মতোই ওজনে হালকা এবং যে কোনো আবহাওয়াতে ভূমি ও আকাশে আক্রমণ চালাতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ বিমানটি কিছুটা দূরত্বে থেকেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

এই সক্ষমতার কারণেই বালাকোটের ঘটনায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এমআইজি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে পেরেছিল জেএফ-১৭ থান্ডার। যুদ্ধবিমান রাফায়েলের অনেক বৈশিষ্ট্য এই যুদ্ধবিমানটিতে আছে।

এই যুদ্ধবিমানটির রেঞ্জ প্রায় দেড়শ কিলোমিটার এবং এতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুকে সঠিকভাবে আঘাত করতে সক্ষম।

পশ্চিমা বিশ্বের উৎপাদিত প্রচলিত যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে পাকিস্তানের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে এই যুদ্ধবিমান কিনতে কিছু দেশের আগ্রহ নিয়ে কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলছেন।

পশ্চিমা প্রতিরক্ষা সামগ্রীর চেয়ে পাকিস্তান কোন সুবিধা বেশি দিচ্ছে, একই সাথে এটা কী বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারের ট্রেন্ডে পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি-না সেই আলোচনাও হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, জেএফ-১৭ থান্ডার চীন ও পাকিস্তানের একটি যৌথ প্রয়াস। এটি দাম, রাজনৈতিক নমনীয়তা ও সহজলভ্যতার কারণে ক্রেতাদের কাছে পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

আধুনিকায়ন ও স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণে একটি সীমাবদ্ধ বাজেটের বিমান বাহিনীগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এর সামরিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ডগলাস ব্যারি বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি হওয়া যুদ্ধবিমানের চেয়ে দামের দিক থেকে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ আকর্ষণীয়।

“সবশেষ এই যুদ্ধবিমানে কার্যকর রাডার ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র সংযোজন করা হয়েছে। জেএফ-১৭ ও চেংদু জে-১০ (এটিও পাকিস্তান ব্যবহৃত হচ্ছে) -এর আগে চীন যুদ্ধবিমানের নকশাকে পশ্চিমা কিংবা রাশিয়ান যুদ্ধবিমানের তুলনায় দুর্বল ভাবা হতো। এখন সক্ষমতার সেই পার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে”।

অন্যদিকে পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো আলেক্স প্লাটসাস বলছেন, তার বিশ্বাস পাকিস্তানের এই যুদ্ধবিমান পছন্দের কারণ হলো রাজনৈতিক–– যারা পশ্চিমাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পছন্দ করে না এবং দামের বিষয়েও সতর্ক।

বিবিসি বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউনিক্লোর ঝলমলে বিক্রি, লাভের পূর্বাভাস বাড়াল ফাস্ট রিটেইলিং

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে

০৮:৫৪:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ তার সাম্প্রতিক পাকিস্তান সফরের সময়ে তাদের কাছ থেকে ‘জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি’ যুদ্ধ বিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানাচ্ছে দেশটির বিমান বাহিনী। এই যুদ্ধবিমানটি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ নামেও পরিচিত।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, এই যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে তারা এখনো কোনো চুক্তিতে পৌঁছাননি, তবে “তারা কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে”।

মঙ্গলবার পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবের সিধুর সাথে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের বৈঠকে এ আলোচনা হয়েছে।

এসময় পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধান বাংলাদেশকে সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহ এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন।

“বৈঠকে সম্ভাব্য জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে,” পাকিস্তান আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

এই যুদ্ধবিমানটি ৪.৫ প্রজন্মের একটি মাল্টি রোল যুদ্ধবিমান যা শক্তিশালী রাডার ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত। এটি বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ মিশনে অংশ নিতে সক্ষম।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সহায়তায় পাকিস্তান এই যুদ্ধ বিমান তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। হালকা ওজনের এই যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা ২০১৯ সালে ও ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের সাথে পাকিস্তানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সময়ে প্রমাণিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

পাকিস্তান ইতোমধ্যে সম্ভবত আজারবাইজার, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে। এছাড়া ইরাক ও লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের সাথে এই বিমান বিক্রি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশ সরকার বা বিমান বাহিনীর দিক থেকে এখনো এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য আসেনি।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান

বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে

বাংলাদেশের এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে গিয়ে দেশটির বিমান বাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

পরে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বৈঠকে কার্যকর সহযোগিতা জোরদার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মহাকাশ খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়”।

“বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কার্যকর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং যুদ্ধে তাদের সাফল্য রেকর্ডের প্রশংসা করেন”।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে বেসিক অ্যাডভান্সড ফ্লাইং থেকে শুরু করে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষায়িত কোর্সসহ সমন্বিত প্রশিক্ষণ সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

এই বৈঠকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান বিমান বাহিনীর পুরনো বিমানগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং আকাশ নজরদারির মান উন্নয়নের জন্য সমন্বিত এয়ার ডিফেন্স রাডার সিস্টেমের বিষয়ে সহযোগিতা পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল পাকিস্তান বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করে। এর মধ্যে আছে ন্যাশনাল আইএসআর ও ইন্টিগ্রেটেড এয়ার অপারেশন্স সেন্টার, পাকিস্তান এয়ার ফোর্স সাইবার কমান্ড এবং ন্যাশনাল অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক।

এ সময় তাদের পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মনুষ্যবিহীন কার্যক্রম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার, স্পেস ও আইএসআর বিষয়ে সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

ওই বিবৃতিতে এই সফরকে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটি প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যাতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তানে তৈরি হচ্ছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান
পাকিস্তানে তৈরি হচ্ছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান

কার কাছে বিক্রি করেছে পাকিস্তান

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিষয়ে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে।

এর প্রথম টেস্ট মডেল ডেভেলপ করা হয়েছিল ২০০৩ সালে এবং ২০১০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রথম জেএফ-১৭ তাদের বাহিনীর বিমান বহরে যোগ করে।

এরপর এমআইজি যুদ্ধবিমান তৈরি করা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান কোম্পানি মিকোয়ানও এ প্রকল্পে যুক্ত হয়।

পুরোনো মিরেজ, এফ-৭ ও এ-৫ যুদ্ধবিমানের জায়গায় নতুন বিমান আনার কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাকিস্তান বিমান বাহিনী জেএফ-১৭ থান্ডার এর নকশা করে।

এই যুদ্ধবিমানটির বিশেষত্ব হলো এটি পাকিস্তানের ভেতরেই তৈরি।

এই যুদ্ধবিমানটি তৈরির পর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশটির বিমান বাহিনীর মুখপাত্র এয়ার কমোডর আহমার রাজা বিবিসিকে বলেছিলেন যে “জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি একটি চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান”।

“ব্লক থ্রি হলো জেএফ-১৭ এর পরবর্তী ভার্সন। এখনো নতুন রাডার সংযোজন করা হয়েছে। এই ভার্সনের যুদ্ধবিমানটিতে নতুন ও আধুনিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজিত হবে। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতাও জোরদার হবে এবং প্রতিটি দিক থেকেই এটি হবে উন্নত,” বলেছিলেন তিনি।

পাকিস্তান এখন পর্যন্ত আজারবাইজান, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে।

গত বছর দেশটি প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় আজারবাইজানের কাছে ৪০টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মুখপাত্র জানাতে রাজি হননি- ঠিক কতটি যুদ্ধবিমান বিক্রি হয়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে যে ইরাক ও লিবিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।

এছাড়া ইরানসহ কয়েকটি দেশ এই যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

সবুজ মাঠের ওপর সবুজ রংয়ের একটি যুদ্ধবিমান
বাংলাদেশও এই বিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান বিমান বাহিনী

এই যুদ্ধবিমান কেনায় আগ্রহ কেন

জেএফ-১৭ আকাশে যুদ্ধের পাশাপাশি ভূমিতে শত্রুর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও হামলায় সক্ষম।

এটি আকাশ থেকে ভূমি এবং আকাশ থেকে আকাশে হামলাযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র বহনে সক্ষম।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধবিমান এফ-১৬ ফ্যালকনের মতোই ওজনে হালকা এবং যে কোনো আবহাওয়াতে ভূমি ও আকাশে আক্রমণ চালাতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ বিমানটি কিছুটা দূরত্বে থেকেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

এই সক্ষমতার কারণেই বালাকোটের ঘটনায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এমআইজি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে পেরেছিল জেএফ-১৭ থান্ডার। যুদ্ধবিমান রাফায়েলের অনেক বৈশিষ্ট্য এই যুদ্ধবিমানটিতে আছে।

এই যুদ্ধবিমানটির রেঞ্জ প্রায় দেড়শ কিলোমিটার এবং এতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুকে সঠিকভাবে আঘাত করতে সক্ষম।

পশ্চিমা বিশ্বের উৎপাদিত প্রচলিত যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে পাকিস্তানের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে এই যুদ্ধবিমান কিনতে কিছু দেশের আগ্রহ নিয়ে কিছু সমালোচক প্রশ্ন তুলছেন।

পশ্চিমা প্রতিরক্ষা সামগ্রীর চেয়ে পাকিস্তান কোন সুবিধা বেশি দিচ্ছে, একই সাথে এটা কী বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারের ট্রেন্ডে পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি-না সেই আলোচনাও হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, জেএফ-১৭ থান্ডার চীন ও পাকিস্তানের একটি যৌথ প্রয়াস। এটি দাম, রাজনৈতিক নমনীয়তা ও সহজলভ্যতার কারণে ক্রেতাদের কাছে পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

আধুনিকায়ন ও স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণে একটি সীমাবদ্ধ বাজেটের বিমান বাহিনীগুলোর জন্য বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এর সামরিক মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ডগলাস ব্যারি বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি হওয়া যুদ্ধবিমানের চেয়ে দামের দিক থেকে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ আকর্ষণীয়।

“সবশেষ এই যুদ্ধবিমানে কার্যকর রাডার ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র সংযোজন করা হয়েছে। জেএফ-১৭ ও চেংদু জে-১০ (এটিও পাকিস্তান ব্যবহৃত হচ্ছে) -এর আগে চীন যুদ্ধবিমানের নকশাকে পশ্চিমা কিংবা রাশিয়ান যুদ্ধবিমানের তুলনায় দুর্বল ভাবা হতো। এখন সক্ষমতার সেই পার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে”।

অন্যদিকে পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো আলেক্স প্লাটসাস বলছেন, তার বিশ্বাস পাকিস্তানের এই যুদ্ধবিমান পছন্দের কারণ হলো রাজনৈতিক–– যারা পশ্চিমাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পছন্দ করে না এবং দামের বিষয়েও সতর্ক।

বিবিসি বাংলা