ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে চলমান Bienal de São Paulo যেন কেবল একটি শিল্প প্রদর্শনী নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব চর্চার নতুন ব্যাখ্যা। এখানে শিল্পীরা প্রশ্ন তুলছেন, মানুষ হওয়া কি জন্মগত অবস্থা, নাকি প্রতিদিনের সচেতন অনুশীলন। এই ভাবনার ভেতর দিয়েই দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে পৃথিবীর অনড় সৌন্দর্য এবং সহমর্মিতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ কল্পনা।
মানবিকতার নতুন অনুশীলন
এই বিয়েনালের কিউরেটরিয়াল ভাবনায় পরিচয় রাজনীতি বা কেবল বৈচিত্র্যের আলোচনা নয়, বরং পৃথিবীর গভীর সৌন্দর্যকে সামনে আনার চেষ্টা স্পষ্ট। এক হাজারের বেশি শিল্পকর্মে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বৈষম্যের বাস্তবতা থাকলেও সামগ্রিক অনুভূতি আশাবাদী। শিল্প এখানে হতাশার গল্প নয়, বরং টিকে থাকার আনন্দময় ভাষা।

প্রকৃতি আর প্রযুক্তির সংলাপ
প্রদর্শনীর অনেক কাজে প্রকৃতি যেন প্রযুক্তিকে পথ দেখায়। ফরাসি শিল্পী লর প্রুভোস্তের একটি যান্ত্রিক ফুল জীবন্ত গাছের শব্দে সাড়া দিয়ে খুলে ও বন্ধ হয়। এই সংলাপে প্রযুক্তি আর প্রকৃতির ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে ভাবতে শেখায় দর্শককে।
পৃথিবীর কণ্ঠ শোনা
নাইজেরীয় শিল্পী এমেকা ওগবোর একটি স্থাপনায় লাল আলোয় ঘেরা অন্ধকার ঘরে শোনা যায় শ্বাস, করাতের শব্দ আর বেদনার গান। মনে হয় পৃথিবী নিজেই তার কষ্টের কথা বলছে। আবার সাও পাওলোর দূষিত তিয়েতে নদীকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি কাজ নদীর জল আর বাতাসের চাপে তৈরি শব্দে পরিবেশের নিজস্ব সুর শোনায়।

সহাবস্থান আর প্রতিরোধের শিল্প
আফ্রো ব্রাজিলীয় শিল্পী দল সেরতাঁও নেগ্রোর কাজ শিল্পকে কেবল বস্তু হিসেবে নয়, বরং জীবনচর্চা হিসেবে তুলে ধরে। ঐতিহাসিক প্রতিরোধের ধারণা থেকে তারা যে সমবায়ী কাঠামো দেখিয়েছে, তা আজকের সমাজে সংহতির মডেল হয়ে ওঠে।
সীমান্ত ছাড়িয়ে সৃষ্টিশীলতা
প্রদর্শনীর শুরুতেই দেখা যায় রেগে সঙ্গীতের ঐতিহ্যবাহী সাউন্ড সিস্টেম। ইতিহাস, নৃত্য আর সংগীত এখানে একসঙ্গে মিশে যায়। গে ভিয়ানা তাঁর কাজে ইউরোপীয় আগমনের ইতিহাসকে কোলাজ, ছবি আর পুরোনো ভিডিওর মাধ্যমে নতুন প্রাণ দেন।

টেকসই ভবিষ্যতের কল্পনা
পশ্চিমা শিল্পবর্জ্য দিয়ে তৈরি জিম্বাবুয়ের শিল্পী মোফাত তাকাদিওয়ার ভাস্কর্য দর্শকদের এক আধ্যাত্মিক যাত্রায় নিয়ে যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে আমাদের বর্তমান ভোগের দিকেই আগে তাকাতে হবে।
আদিবাসী জ্ঞানের পুনরুদ্ধার
বিয়েনালের অনেক কাজ আধুনিক বিজ্ঞানের একচ্ছত্র আধিপত্যকে প্রশ্ন করে আদিবাসী জ্ঞানকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। সামি শিল্পী জোয়ার নাঙ্গোর স্থাপনাটি একই সঙ্গে পাঠাগার ও মিলনকেন্দ্র, যেখানে প্রাচীন জ্ঞান আজকের বাস্তবতায় ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে সাহসী স্বপ্ন
কিছু কাজ ভবিষ্যৎকে কল্পনা করেছে আশ্চর্য রকমের কোমলতায়। মানাউরারা ক্লানডেস্তিনার প্রকল্পে নিপীড়নের মাঝেও মানুষে মানুষে বাঁচিয়ে রাখার গল্প বলা হয়েছে। এই আশাবাদই বিয়েনালের সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা।












সারাক্ষণ রিপোর্ট 










