পাকিস্তানে নারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা পণ্যের ওপর আরোপিত তথাকথিত ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন তরুণ আইনজীবী ও সমাজকর্মী মাহনূর ওমর। কৈশোর থেকেই নারীর অধিকার ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা নিয়ে কাজ করা এই তরুণী এবার সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন, লক্ষ্য একটাই—মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রীর ওপর আরোপিত উচ্চ করের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই।
এই মামলাকে ঘিরে পাকিস্তানে দীর্ঘদিনের এক নীরব ও ট্যাবু বিষয়—মাসিক—নিয়ে এখন জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কৈশোর থেকেই সামাজিক পরিবর্তনের পথে
মাহনূর ওমরের জীবনের মোড় ঘুরে যায় কিশোর বয়সেই। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি লক্ষ্য করেন, একটি বড় বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে মেয়েদের যৌন সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না। এতে হতাশ হয়ে তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘নূর ফাউন্ডেশন’।
এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি গ্রামের মেয়েদের জন্য কর্মশালা আয়োজন করেন। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মাসিক স্বাস্থ্য—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হতো।
কিছুদিন পর আরেকটি ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। নিজের বাড়ির এক গৃহকর্মীর সঙ্গে মাসিকের সময় ব্যবহৃত প্যাড ও ট্যাম্পনের দাম নিয়ে কথোপকথনের সময় তিনি বুঝতে পারেন, অনেক নারীর জন্য এসব প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
পিরিয়ড ট্যাক্স ও নারীদের বাস্তবতা
পাকিস্তানে মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রীর ওপর বিভিন্ন ধরনের কর আরোপ করা হয়, যার ফলে বাজারে এসব পণ্যের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে অনেক গ্রামাঞ্চলে এই পণ্য পাওয়া যায় না, কারণ এত দামি পণ্যের চাহিদাই তৈরি হয় না।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ নারী বাণিজ্যিকভাবে তৈরি প্যাড বা ট্যাম্পন ব্যবহার করেন।
অধিকাংশ নারী বাধ্য হয়ে কাপড় ব্যবহার করেন, যা অনেক সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এর ফলে ত্বকে ফুসকুড়ি বা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা মাসিকের সময় স্কুলেও যেতে পারে না।
আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা
এই বাস্তবতাই মাহনূর ওমরকে আইনি পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত করে। প্রায় এক দশক ধরে সামাজিক কাজের অভিজ্ঞতা এবং আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন।
মামলায় তিনি মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রীর ওপর আরোপিত করকে বৈষম্যমূলক বলে চ্যালেঞ্জ করেন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে মামলার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে আদালত সরকারের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই মামলা পাকিস্তানজুড়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বহু মানুষ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলছেন। এমনকি মাহনূরের নিজের পরিবারেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি জানান, তার বাবা ও চাচাতো ভাইয়েরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কারণ তারা মনে করেন এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে তাদের মেয়েদের জীবন সহজ করবে।
নারীর সমতার লড়াইয়ে দীর্ঘ পথ
বর্তমানে মাহনূর ওমর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে একটি খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘লিঙ্গ, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। তবে তার কাছে এই মামলা কেবল শুরু।
তিনি মনে করেন, সমাজে নারীর প্রতি যে বৈষম্য রয়েছে তা দূর করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম প্রয়োজন।
মাহনূরের ভাষায়, তিনি নিজেকে মুক্ত মনে করতে পারবেন না যতক্ষণ না সব নারী সমান অধিকার পায়। আগামী কয়েক দশকে তিনি আইনজীবী হিসেবে নিজের দেশের নারী ও লিঙ্গ সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে চান।
একটি ট্যাবু ভেঙে জাতীয় আলোচনা
মাহনূরের উদ্যোগ পাকিস্তানে এমন একটি বিষয়ে জাতীয় আলোচনা শুরু করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ট্যাবুর আড়ালে ছিল।
এই আইনি লড়াইয়ের ফলাফল যাই হোক না কেন, অনেকের মতে ইতোমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে—মাসিক স্বাস্থ্য আর নিছক ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি এখন সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
মেটা বর্ণনা: পাকিস্তানে পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের মামলা ঘিরে শুরু হয়েছে জাতীয় বিতর্ক ও নারীর স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















