০৯:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
আসিয়ান জ্বালানি সংকটে তড়িঘড়ি তেল ভাগাভাগি চুক্তির পথে, হরমুজ ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ রেস্তোরাঁ খাত বাঁচাতে কর কমানো ও গ্যাস সংযোগ চালুর দাবি হাওরে ভেজা ধান নিয়ে কৃষকের কান্না, মিলছে না ক্রেতা বা সরকারি সহায়তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল সংকট সীমান্তে, না অবিশ্বাসে? জ্বালানি সংকটে সংযমের আহ্বান মোদির, আমদানি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর বিজয়ের উত্থান, কংগ্রেসের সংকট এবং ভারতের বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ জাহানারা ইমাম: এক মায়ের শোক থেকে জাতির বিবেক হয়ে ওঠার গল্প টিকের কামড়ে বাড়ছে ঝুঁকি, যুক্তরাষ্ট্রে ছড়াচ্ছে ছয় বিপজ্জনক রোগ ১৯২৬ সালের ব্রিটিশ সাধারণ ধর্মঘট: শ্রমিকদের হার, না কি শাসকশ্রেণির নৈতিক পরাজয়? মা: ভালোবাসার প্রথম ঠিকানা

বিজয়ের উত্থান, কংগ্রেসের সংকট এবং ভারতের বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের উত্থান শুধু একটি আঞ্চলিক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ভারতের বিরোধী রাজনীতির গভীর সংকট ও পুনর্গঠনের ইঙ্গিতও বহন করছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বক্তব্যেই “ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়বিচার”কে নতুন যুগের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই শব্দচয়ন কেবল আদর্শিক অবস্থান নয়, বর্তমান ভারতের বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় ভাষাও হয়ে উঠেছে।

গত কয়েক বছরে ভারতের রাজনীতিতে “ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দটি শুধু একটি সাংবিধানিক মূল্যবোধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; এটি বিরোধী শক্তিগুলোর জন্য বিজেপিবিরোধী ঐক্যের প্রধান রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম শুরু থেকেই নিজেদের পরিচয় দাঁড় করিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দ্রাবিড় আদর্শের ওপর। বিজেপির সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা না করার প্রতিশ্রুতিও তিনি বারবার প্রকাশ্যে বলেছেন।

এই অবস্থানই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, কংগ্রেস কি আদর্শগত মিত্র খুঁজছে, নাকি নিজেদের দুর্বলতার কারণে নতুন আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করেছে। একসময় যে ডিএমকে ছিল কংগ্রেসের প্রধান মিত্র, এখন সেই ডিএমকের বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে বিজয়ের দল। অর্থাৎ কংগ্রেস আবারও এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে নিজেদের শক্তিতে নয়, বরং আঞ্চলিক নেতাদের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই তারা রাজনৈতিক টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বিজয়ের প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতাও এই নতুন সমীকরণের প্রতীক। শপথ অনুষ্ঠানে তাঁদের আন্তরিকতা শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল না; সেটি ছিল বিরোধী রাজনীতির নতুন ভাষা নির্মাণের প্রচেষ্টা। রাহুল এখন ক্রমাগত “ভালোবাসা বনাম ঘৃণা”, “সংবিধান বনাম বিভাজন” ধরনের আদর্শিক লড়াইয়ের কথা বলছেন। বিজয়ের বক্তব্যেও একই সুর শোনা যাচ্ছে। ফলে দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি স্বাভাবিক মিল তৈরি হয়েছে।

বিধানসভা নির্বাচনে ভারতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের বার্তা

তবে এই সমীকরণের মধ্যেই বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের ভাঙনের লক্ষণও স্পষ্ট। ডিএমকের ক্ষোভ, বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের আলাদা কৌশল, এবং রাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিজেপিবিরোধী ঐক্য বাস্তবে যতটা জটিল, বক্তব্যে তা ততটা সহজ নয়। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি, বিহারে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি—সবারই নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব আছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যের ভাষা থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থেকেই যাচ্ছে।

বিজয়ের উত্থান আরেকটি বিষয়ও সামনে এনেছে। ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে এখনো চলচ্চিত্র তারকাদের জনপ্রিয়তা বড় রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। এমজিআর, জয়ললিতা থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের বহু রাজনৈতিক ইতিহাসে তার প্রমাণ রয়েছে। বিজয় সেই ধারার নতুন প্রতিনিধি। তবে তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য কেবল তারকাখ্যাতির কারণে হয়নি; তিনি এমন এক সময়ে সামনে এসেছেন, যখন বিজেপিবিরোধী ভোটের একটি বড় অংশ নতুন মুখ খুঁজছিল।

কিন্তু এই নতুন রাজনীতি কতটা স্থায়ী হবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ আদর্শিক ভাষণ আর নির্বাচনী বাস্তবতা এক নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা বা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষা বিরোধী শিবিরকে একত্র করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে নেতৃত্ব, আসন ভাগাভাগি, আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের সংঘাতই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় জোট কতটা টিকে থাকবে।

ভারতের বিরোধী রাজনীতির সামনে তাই এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও জাতীয়তাবাদী বয়ানের মোকাবিলা করা, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যকার অবিশ্বাস সামাল দেওয়া। বিজয়ের উত্থান সেই সংকটকে নতুনভাবে দৃশ্যমান করেছে। তিনি হয়তো দক্ষিণ ভারতে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার মুখ, কিন্তু তাঁর আবির্ভাব একই সঙ্গে কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

ভারতের রাজনীতিতে এখন “ধর্মনিরপেক্ষতা” শুধু একটি আদর্শিক শব্দ নয়; এটি ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরির হাতিয়ার। কিন্তু সেই সমীকরণ শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলো আদর্শের বাইরে বাস্তব রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারে কি না তার ওপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

আসিয়ান জ্বালানি সংকটে তড়িঘড়ি তেল ভাগাভাগি চুক্তির পথে, হরমুজ ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ

বিজয়ের উত্থান, কংগ্রেসের সংকট এবং ভারতের বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ

০৮:১০:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের উত্থান শুধু একটি আঞ্চলিক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ভারতের বিরোধী রাজনীতির গভীর সংকট ও পুনর্গঠনের ইঙ্গিতও বহন করছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বক্তব্যেই “ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়বিচার”কে নতুন যুগের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই শব্দচয়ন কেবল আদর্শিক অবস্থান নয়, বর্তমান ভারতের বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় ভাষাও হয়ে উঠেছে।

গত কয়েক বছরে ভারতের রাজনীতিতে “ধর্মনিরপেক্ষতা” শব্দটি শুধু একটি সাংবিধানিক মূল্যবোধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; এটি বিরোধী শক্তিগুলোর জন্য বিজেপিবিরোধী ঐক্যের প্রধান রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম শুরু থেকেই নিজেদের পরিচয় দাঁড় করিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দ্রাবিড় আদর্শের ওপর। বিজেপির সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা না করার প্রতিশ্রুতিও তিনি বারবার প্রকাশ্যে বলেছেন।

এই অবস্থানই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসকে তাঁর পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, কংগ্রেস কি আদর্শগত মিত্র খুঁজছে, নাকি নিজেদের দুর্বলতার কারণে নতুন আঞ্চলিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করেছে। একসময় যে ডিএমকে ছিল কংগ্রেসের প্রধান মিত্র, এখন সেই ডিএমকের বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে বিজয়ের দল। অর্থাৎ কংগ্রেস আবারও এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে নিজেদের শক্তিতে নয়, বরং আঞ্চলিক নেতাদের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই তারা রাজনৈতিক টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বিজয়ের প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতাও এই নতুন সমীকরণের প্রতীক। শপথ অনুষ্ঠানে তাঁদের আন্তরিকতা শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল না; সেটি ছিল বিরোধী রাজনীতির নতুন ভাষা নির্মাণের প্রচেষ্টা। রাহুল এখন ক্রমাগত “ভালোবাসা বনাম ঘৃণা”, “সংবিধান বনাম বিভাজন” ধরনের আদর্শিক লড়াইয়ের কথা বলছেন। বিজয়ের বক্তব্যেও একই সুর শোনা যাচ্ছে। ফলে দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একটি স্বাভাবিক মিল তৈরি হয়েছে।

বিধানসভা নির্বাচনে ভারতের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের বার্তা

তবে এই সমীকরণের মধ্যেই বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের ভাঙনের লক্ষণও স্পষ্ট। ডিএমকের ক্ষোভ, বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের আলাদা কৌশল, এবং রাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিজেপিবিরোধী ঐক্য বাস্তবে যতটা জটিল, বক্তব্যে তা ততটা সহজ নয়। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি, বিহারে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি—সবারই নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব আছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যের ভাষা থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থেকেই যাচ্ছে।

বিজয়ের উত্থান আরেকটি বিষয়ও সামনে এনেছে। ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে এখনো চলচ্চিত্র তারকাদের জনপ্রিয়তা বড় রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। এমজিআর, জয়ললিতা থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের বহু রাজনৈতিক ইতিহাসে তার প্রমাণ রয়েছে। বিজয় সেই ধারার নতুন প্রতিনিধি। তবে তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য কেবল তারকাখ্যাতির কারণে হয়নি; তিনি এমন এক সময়ে সামনে এসেছেন, যখন বিজেপিবিরোধী ভোটের একটি বড় অংশ নতুন মুখ খুঁজছিল।

কিন্তু এই নতুন রাজনীতি কতটা স্থায়ী হবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ আদর্শিক ভাষণ আর নির্বাচনী বাস্তবতা এক নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা বা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষা বিরোধী শিবিরকে একত্র করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে নেতৃত্ব, আসন ভাগাভাগি, আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের সংঘাতই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় জোট কতটা টিকে থাকবে।

ভারতের বিরোধী রাজনীতির সামনে তাই এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও জাতীয়তাবাদী বয়ানের মোকাবিলা করা, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যকার অবিশ্বাস সামাল দেওয়া। বিজয়ের উত্থান সেই সংকটকে নতুনভাবে দৃশ্যমান করেছে। তিনি হয়তো দক্ষিণ ভারতে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার মুখ, কিন্তু তাঁর আবির্ভাব একই সঙ্গে কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

ভারতের রাজনীতিতে এখন “ধর্মনিরপেক্ষতা” শুধু একটি আদর্শিক শব্দ নয়; এটি ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরির হাতিয়ার। কিন্তু সেই সমীকরণ শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলো আদর্শের বাইরে বাস্তব রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারে কি না তার ওপর।