ব্রিটেনের ইতিহাসে একমাত্র সাধারণ ধর্মঘটটি হয়েছিল ১৯২৬ সালের মে মাসে। প্রায় ৩০ লাখ শ্রমিক রেল, বাস, বন্দর, সংবাদপত্র ও শিল্পকারখানার কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ধর্মঘটটি ছিল মূলত কয়লাখনি শ্রমিকদের পক্ষে সংহতির প্রকাশ। খনি মালিকরা তখন মজুরি কমানো এবং কাজের সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। বিশ্ববাজারে কয়লার দাম পড়ে যাওয়ার অজুহাতে শ্রমিকদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করা হচ্ছিল। এই ঐতিহাসিক ধর্মঘট নিয়েই নতুন বই লিখেছেন ইতিহাসবিদ জোনাথন শ্নিয়ার। সেই বইয়ের পর্যালোচনায় ইতিহাসবিদ ম্যাক্স হেস্টিংস তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ শাসকশ্রেণি ও শ্রমিক আন্দোলনের এক জটিল বাস্তবতা।
খনিশ্রমিকদের নির্মম জীবন
বইটিতে ১৯২০-এর দশকের খনিশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সে সময় ব্রিটেনের কয়লাখনিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ কাজ করতেন। অধিকাংশই ছিলেন ভূগর্ভস্থ শ্রমিক। দুর্ঘটনায় বছরে প্রায় ১২০০ শ্রমিক মারা যেতেন। যারা বেঁচে থাকতেন, তাদের অনেকেই ফুসফুসের রোগে অকালমৃত্যুর শিকার হতেন।
অন্যদিকে খনি মালিকদের বিরুদ্ধে লেখক কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইন নিজেও ছিলেন খনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বড় মালিকদের মধ্যে ইভান উইলিয়ামস ও অ্যাডাম নিম্মো শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিরোধিতা করেন। এমনকি তারা শ্রমিকদের আরও বেশি সময় কাজ করাতে চেয়েছিলেন। অভিজাত জমিদার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিপুল সম্পদ অর্জন করলেও শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে খুব কমই ভাবতেন।
‘রেড পেরিল’ আতঙ্ক
রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের কয়েক বছরের মধ্যেই এই ধর্মঘট সংঘটিত হয়। ফলে ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির মধ্যে কমিউনিজম নিয়ে ভয় ছিল প্রবল। শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত যে কাউকেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছিল। গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই ধর্মঘটকারীদের নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন। সমাজের উচ্চবিত্ত অংশ ধর্মঘটকে শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিদ্রোহ হিসেবেও দেখছিল।

ট্রেড ইউনিয়নের দুর্বলতা
ধর্মঘটের নেতৃত্বে থাকা ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস বা টিইউসির অন্যতম নেতা ছিলেন জে এইচ টমাস। তিনি একদিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালালেও অন্যদিকে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। লেখকের মতে, ধর্মঘটের নেতৃত্বে স্পষ্ট কৌশল ও প্রস্তুতির অভাব ছিল। সরকার আগে থেকেই সেনা মোতায়েন, খাদ্য সরবরাহ ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিকল্পনা করে রেখেছিল। বিপরীতে টিইউসি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত ছিল না। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ধর্মঘটকারীদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে।
নয় দিনের সমাপ্তি
মাত্র নয় দিনের মাথায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। শ্রমিক নেতারা ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে ধর্মঘট শেষের ঘোষণা দেন। খনিশ্রমিকরা পরে আরও দুর্বল অবস্থায় কাজে ফিরতে বাধ্য হন। সরকারের অনেক সমর্থক এই ঘটনাকে পুঁজিবাদের বড় জয় হিসেবে দেখেছিলেন। তবে লেখক মনে করেন, এটি ছিল শ্রমিকদের একটি “গৌরবময় ব্যর্থতা”। কারণ আন্দোলনটি ব্রিটিশ সমাজে শ্রেণিবৈষম্য, শোষণ ও শ্রমিক জীবনের বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছিল।
পরবর্তী সময়ের প্রতিধ্বনি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের কয়লাখনিতে আবারও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯২৬ সালের অভিজ্ঞতা শ্রমিক সমাজের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছিল। সেই ক্ষত বহু বছর ধরে থেকে যায়। পরবর্তীতে কয়লাশিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হলেও ১৯২৬ সালের সাধারণ ধর্মঘট ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক প্রতীকী অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯২৬ সালের সাধারণ ধর্মঘট নিয়ে নতুন বইয়ে ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, শ্রেণিসংঘাত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















