গরমের মৌসুম শুরু হতেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আবারও বাড়ছে টিকের উপদ্রব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টিতে বাইরে সময় কাটানোর পর শরীরে টিক পাওয়া যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকের কামড় নিয়ে জরুরি বিভাগে রোগী যাওয়ার সংখ্যাও আগের তুলনায় দ্রুত এবং বেশি হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিক শরীরে লেগে থাকার সময় যত বাড়ে, ততই বাড়ে সংক্রমণের ঝুঁকি। কারণ, টিকের মাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে পরিচিত টিকবাহিত রোগ লাইম ডিজিজ হলেও এর বাইরেও একাধিক গুরুতর রোগ ছড়িয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকেরা।
লাইম ডিজিজ: সবচেয়ে পরিচিত কিন্তু একমাত্র নয়
লাইম ডিজিজ মূলত ব্ল্যাক-লেগড বা ডিয়ার টিকের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিড-আটলান্টিক অঞ্চল ও আপার মিডওয়েস্টে বেশি দেখা যায়। ২০২৩ সালে এ রোগের আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৯ হাজার। তবে রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ধারণা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘বুলস-আই’ আকৃতির লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়। চিকিৎসা না হলে পরে জয়েন্টে ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক সমস্যা এমনকি মুখ বেঁকে যাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
রেড মিট খেলেই অ্যালার্জি: আলফা-গ্যাল সিনড্রোম
লোন স্টার টিকের মাধ্যমে ছড়ানো আলফা-গ্যাল সিনড্রোম অন্য রোগগুলোর চেয়ে আলাদা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি গরু, খাসি বা শূকরের মাংস খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর মারাত্মক অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে বমি, পেটব্যথা, ডায়রিয়া বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, আবার কারও শরীরে তীব্র অ্যানাফাইল্যাক্সিসও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লোন স্টার টিকের বিস্তার নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে এ রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। বর্তমানে এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্তদের অনেক সময় লাল মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হয়।
অ্যানাপ্লাজমোসিস ও বেবিসিওসিসের বাড়তি উদ্বেগ
অ্যানাপ্লাজমোসিসের লক্ষণ অনেকটাই ফ্লুর মতো। জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথার পাশাপাশি অনেক রোগীর পেটের সমস্যাও দেখা দেয়। এটি লাইম ডিজিজ বহনকারী একই ধরনের টিক থেকে ছড়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে দুই রোগ একসঙ্গেও হতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডক্সিসাইক্লিন অ্যান্টিবায়োটিক দ্রুত কাজ করে এবং বেশ কার্যকর।
অন্যদিকে বেবিসিওসিস একটি পরজীবীজনিত রোগ। এটি লোহিত রক্তকণিকায় আক্রমণ করে। ফলে জ্বর, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা তৈরি হতে পারে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের জন্য এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
এহরলিকিওসিস ও রকি মাউন্টেন স্পটেড ফিভার
এহরলিকিওসিসেও জ্বর, বমিভাব, মাথাব্যথা ও শরীর কাঁপার মতো উপসর্গ দেখা যায়। শিশুদের মধ্যে অনেক সময় লালচে দাগও তৈরি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি বা অঙ্গ বিকলের ঝুঁকি থাকে।
সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি হলো রকি মাউন্টেন স্পটেড ফিভার। এটি রক্তনালি, মস্তিষ্ক ও শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। চিকিৎসকদের ভাষায়, বর্তমানে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী টিকবাহিত রোগ। দ্রুত ডক্সিসাইক্লিন শুরু না করলে রোগীর অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।
সতর্ক থাকার পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরে টিক পাওয়া গেলে দ্রুত সেটি সরিয়ে ফেলতে হবে এবং সম্ভব হলে ছবি তুলে রাখতে হবে। এতে চিকিৎসকেরা টিকের ধরন শনাক্ত করতে পারবেন এবং কোন রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তা বোঝা সহজ হবে। টিকের কামড়ের পর জ্বর, ব্যথা বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















