মা মানে শুধু সন্তানের আশ্রয় নন, অনেক সময় তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসেরও এক অনিবার্য চরিত্র। বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক নাম জাহানারা ইমাম। তিনি শুধু শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমীর মা নন, তিনি একাত্তরের বেদনা, সাহস, প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। মা দিবসে জাহানারা ইমামকে স্মরণ মানে কেবল একজন সন্তানের জন্য কাঁদতে থাকা মাকে স্মরণ করা নয়; বরং এমন এক মাকে স্মরণ করা, যিনি ব্যক্তিগত শোককে জাতির সংগ্রামে রূপ দিয়েছিলেন।
১৯২৯ সালের ৩ মে মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া জাহানারা ইমাম ছিলেন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা এবং গভীর মানবিক বোধসম্পন্ন একজন নারী। তাঁর জীবন ছিল পরিবার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর বড় ছেলে শফি ইমাম রুমী ছিলেন এক উজ্জ্বল তরুণ। প্রকৌশল পড়তে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও দেশের সংকটময় মুহূর্তে তিনি অস্ত্র হাতে নেন।
একাত্তরের সেই দিনগুলোতে জাহানারা ইমাম শুধু ছেলের জন্য উদ্বিগ্ন এক মা ছিলেন না; তিনি বুঝতেন, স্বাধীনতার লড়াই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও বড়। রুমী গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। ঢাকা শহরে বিভিন্ন অভিযানে যুক্ত হন। প্রতিটি রাতে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় থাকতেন জাহানারা ইমাম, কিন্তু কখনও তাঁকে থামতে বলেননি।

রুমীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার রাত
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা রুমীকে ধরে নিয়ে যায়। সেই রাতে জাহানারা ইমামের পরিবারের আরও সদস্যকেও আটক করা হয়। শুরু হয় এক মায়ের অসহায় অপেক্ষা। নির্যাতনের ভয়াবহতা জেনেও তিনি আশা ছাড়েননি। কিন্তু রুমী আর ফিরে আসেননি।
একজন মায়ের জন্য সন্তানের হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলোর একটি। কিন্তু জাহানারা ইমাম সেই শোককে নীরব কান্নায় আটকে রাখেননি। তিনি কলম ধরেন। তিনি লিখতে শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা, নিজের ভাঙা হৃদয়ের কথা, একটি জাতির রক্তাক্ত জন্মের কথা।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ শুধু একটি ডায়েরি নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মানবিক দলিল। সেখানে যেমন যুদ্ধের ভয়াবহতা আছে, তেমনি আছে একজন মায়ের অন্তর্দহন। রুমীর জন্য অপেক্ষা, আতঙ্ক, আশা ও বেদনা—সবকিছুই উঠে এসেছে গভীর সততায়।

শহীদ জননীর নতুন সংগ্রাম
স্বাধীনতার পরও জাহানারা ইমামের লড়াই থামেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া তাঁকে ব্যথিত করত। নব্বইয়ের দশকে তিনি আবার রাস্তায় নামেন। গড়ে তোলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তিনি হয়ে ওঠেন গণআন্দোলনের মুখ।
এ সময় মানুষ তাঁকে নতুন এক পরিচয়ে চিনতে শুরু করে—‘শহীদ জননী’। এই পরিচয়ের মধ্যে ছিল তাঁর মাতৃত্বের গভীরতা, আবার ছিল প্রতিবাদের দৃঢ়তাও। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, মা শুধু সন্তানের জন্য কাঁদেন না; প্রয়োজন হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে পুরো জাতিকেও জাগিয়ে তুলতে পারেন।
জাহানারা ইমামের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর নৈতিক সাহস। তিনি জানতেন, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ নয়। তবু তিনি থামেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।
মা দিবসে জাহানারা ইমামকে স্মরণ করার বিশেষ তাৎপর্য এখানেই। তিনি আমাদের শেখান, মাতৃত্ব শুধু কোমলতার নয়, এটি প্রতিরোধেরও শক্তি। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কখনও কখনও একটি জাতির বিবেক হয়ে উঠতে পারে।

আজকের বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নতুন প্রজন্ম জানতে চায়, তখন জাহানারা ইমামের নাম অনিবার্যভাবে সামনে আসে। কারণ তিনি কেবল ইতিহাসের একজন চরিত্র নন; তিনি বাংলাদেশের চেতনার এক জীবন্ত প্রতীক।
মা দিবসে সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তাই জাহানারা ইমামকে আলাদা করে স্মরণ করতেই হয়। কারণ তিনি দেখিয়েছেন, একজন মা কখনও কখনও পুরো জাতির সাহস হয়ে উঠতে পারেন।
জাহানারা ইমাম, শহীদ জননী, রুমী, মুক্তিযুদ্ধ, মা দিবস
মা দিবসে শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে স্মরণ। এক মায়ের ব্যক্তিগত শোক কীভাবে জাতির বিবেকে পরিণত হয়েছিল, সেই ইতিহাসের গল্প।
মা দিবসে জাহানারা ইমামকে স্মরণ করা মানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ত্যাগ ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামকে নতুন করে মনে করা। শহীদ জননীর জীবন আজও অনুপ্রেরণা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















