দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে প্রায়ই “অপরিহার্য” বলা হয়। ভূগোল, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির জটিল বাস্তবতায় দুই দেশ এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, একে অন্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু এই সম্পর্কের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্বস্তিকর দ্বৈততা কাজ করছে। একদিকে সহযোগিতার ভাষা, অন্যদিকে সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা উদ্বেগ। ফলে সম্পর্ক যতই কূটনৈতিক ভাষায় “বন্ধুত্বপূর্ণ” হিসেবে বর্ণিত হোক, বাস্তবের সীমান্তে তার ভিন্ন প্রতিফলন দেখা যায়।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক পঙ্কজ সরণের বক্তব্য সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। তিনি সীমান্ত হত্যাকে “দুর্ভাগ্যজনক” বলেছেন, কিন্তু একই সঙ্গে সীমান্ত অর্থনীতির একটি অস্বীকার করা যায় না এমন সত্যও তুলে ধরেছেন—বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে চোরাচালান, অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার ও স্থানীয় অপরাধচক্র। ফলে সীমান্ত শুধু একটি ভূরাজনৈতিক রেখা নয়; এটি বহু মানুষের জীবিকা, ভয়, লোভ ও রাষ্ট্রিক ব্যর্থতার সংযোগস্থল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতা কি সীমান্ত হত্যার নৈতিক দায় কমিয়ে দেয়? কোনোভাবেই নয়। বরং এটিই দেখায় যে, দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতি কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। যদি সীমান্তে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ নিহত হন, তবে বোঝা যায় রাষ্ট্রগুলোর ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে গভীর ঘাটতি রয়েছে। সীমান্তকে কেবল “হুমকির অঞ্চল” হিসেবে দেখলে সেখানে মানবিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা আড়ালে পড়ে যায়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। এত দীর্ঘ সীমান্তে কাঁটাতার, টহল বা গুলি দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক আস্থার পরিবেশ। পঙ্কজ সরণ যেভাবে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে “ফোন তুলে সমস্যার সমাধান” করার সংস্কৃতির কথা বলেছেন, সেটি আসলে কূটনীতির একটি মৌলিক সত্যকে মনে করিয়ে দেয়—সংঘাতের চেয়ে যোগাযোগ বেশি কার্যকর।

তবে এই সম্পর্কের আরেকটি জটিল স্তর রয়েছে। ভারত বারবার বাংলাদেশে উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্তপারের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের দিক থেকেও ভারতের গোয়েন্দা তৎপরতা, সীমান্তে বলপ্রয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে সহযোগিতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে গভীর সন্দেহও। এই সন্দেহই দুই দেশের জনমতের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।
আসলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো কোনো একক ঘটনা নয়; বরং “অসম প্রত্যাশা”। বাংলাদেশ চায় সম্মানজনক ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক। ভারত চায় একটি নিরাপদ প্রতিবেশ, যেখানে তার কৌশলগত স্বার্থ ঝুঁকির মুখে পড়বে না। এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করতে না পারলে সম্পর্ক বারবার আবেগ ও উত্তেজনার চক্রে আটকে যাবে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক মাদকপাচার, রোহিঙ্গা সংকট এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার এখন শুধু কোনো এক দেশের সমস্যা নয়। বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই একই ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাস্তবে অনেক বড়।
কিন্তু সহযোগিতা তখনই টেকসই হয়, যখন তা কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নয়, মানুষের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেয়। সীমান্তে যদি মানুষ মারা যায়, যদি সাধারণ জনগণ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকে, তবে কূটনৈতিক বৈঠক বা যৌথ বিবৃতি দিয়ে সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করা যায় না। দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের ওপর—তারা কি সীমান্তকে সংঘাতের প্রতীক হিসেবে রাখবে, নাকি পারস্পরিক আস্থার পরীক্ষাগার হিসেবে গড়ে তুলবে?
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তাই শুধু কৌশলগত হিসাবের বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তববাদী সহযোগিতারও পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















