ডলারের বিকল্প হিসেবে শুরু হলেও এখন মার্কিন ডলারের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে ক্রিপ্টো বাজারের দ্রুত বর্ধনশীল মুদ্রা ‘স্টেবলকয়েন’। এর বাজারমূল্য কয়েক বছরের মধ্যেই কয়েকগুণ বেড়েছে, তবে নিয়ন্ত্রক ও ব্যাংকাররা সতর্ক করছেন সম্ভাব্য বড় আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে।
ডলারের সঙ্গে বাঁধা ক্রিপ্টো মুদ্রার বিস্তার
ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর ধারণা থেকে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ক্রিপ্টো বাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এমন একটি ডিজিটাল মুদ্রা, যার মূল্য সরাসরি ডলারের সঙ্গে যুক্ত। এই মুদ্রাকেই বলা হয় স্টেবলকয়েন।
স্টেবলকয়েন এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এর মূল্য প্রায় স্থির থাকে এবং সাধারণত এক ডলারের সমান থাকে। ক্রিপ্টো বাজারে দাম ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই অন্য মুদ্রা থেকে স্টেবলকয়েনে চলে আসেন। ফলে তারা ব্লকচেইনের ভেতরেই থেকে ঝুঁকি কমাতে পারেন।
গত কয়েক বছরে এই মুদ্রার বাজার দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। দুই হাজার বিশ সালে যেখানে এর মোট বাজারমূল্য ছিল প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার, সেখানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিনশ বিলিয়ন ডলারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বাজার তিন ট্রিলিয়ন ডলারেও পৌঁছাতে পারে।
ট্রেজারি বাজারে বাড়ছে প্রভাব
স্টেবলকয়েনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর পেছনে সাধারণত মার্কিন সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্র রাখা হয়। ফলে ক্রিপ্টো বাজারের অর্থ ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে, যা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বর্তমানে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন পরিমাণ মার্কিন ঋণপত্র ধরে রেখেছে যা কিছু বড় দেশের মালিকানাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে একদিকে ট্রেজারি বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে।
তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যদি বড় ধরনের ক্রিপ্টো ধস নামে, তাহলে স্টেবলকয়েন কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে দ্রুত বিপুল পরিমাণ ট্রেজারি ঋণপত্র বিক্রি করতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি ঋণবাজারে বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে নতুন আইন
যুক্তরাষ্ট্রে এই বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নতুন আইন ও নিয়ম তৈরির কাজ চলছে। গত বছর পাস হওয়া একটি আইনের অধীনে এখন নির্ধারণ করা হচ্ছে কোন ধরনের সম্পদ স্টেবলকয়েনের নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান এই মুদ্রা ইস্যু করতে পারবে।
এছাড়া অর্থপাচার প্রতিরোধ, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়েও নতুন নিয়ম তৈরি করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়মগুলো কার্যকর হলে স্টেবলকয়েন বাজার আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে।
আগের ধসের অভিজ্ঞতা
ক্রিপ্টো বাজারে অস্থিরতা নতুন নয়। দুই হাজার বাইশ এবং দুই হাজার তেইশ সালে বড় ধরনের সংকটের সময় কিছু স্টেবলকয়েন তাদের ডলার সমমানের মূল্য ধরে রাখতে পারেনি।
একটি বড় ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ধসে পড়ার পর বিনিয়োগকারীরা একযোগে তাদের টাকা তুলতে শুরু করেন। তখন কিছু স্টেবলকয়েনের মূল্য এক ডলারের নিচে নেমে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে সক্ষম হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতাই নিয়ন্ত্রকদের সতর্ক করে তুলেছে। তাদের মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা এই বাজারের ঝুঁকি সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করলে তা বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্ভাবনাও দেখছেন অনেক অর্থনীতিবিদ
তবে সবাই এই প্রবণতাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, স্টেবলকয়েনের বিস্তার আন্তর্জাতিক লেনদেনকে আরও দ্রুত ও সস্তা করতে পারে।
বিশেষ করে যেসব দেশে স্থানীয় মুদ্রা অস্থির, সেখানে মানুষ ডিজিটাল ডলার হিসেবে স্টেবলকয়েন ব্যবহার করছে। এছাড়া বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা এই মুদ্রা ব্যবহার করে স্বল্প খরচে দেশে অর্থ পাঠাতে পারছেন।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, স্টেবলকয়েনের চাহিদা বাড়লে মার্কিন ডলার ও সরকারের ঋণপত্রের চাহিদাও বাড়বে। এতে সুদের হার কমে আসতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডলারের প্রভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সামনে বড় প্রশ্ন
স্টেবলকয়েনের উত্থান তাই একদিকে নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন ঝুঁকিও। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই দ্রুত বেড়ে ওঠা ডিজিটাল মুদ্রা কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে, নাকি নতুন ধরনের আর্থিক সংকটের দরজা খুলে দেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















