০১:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬
কেরালার কারিগরদের হাতে ফিরল প্রাচীন নৌযানের গৌরব, সমুদ্রে পাড়ি দিল কৌণ্ডিন্য ইউনিক্লোর ঝলমলে বিক্রি, লাভের পূর্বাভাস বাড়াল ফাস্ট রিটেইলিং ঋণের বদলে যুদ্ধবিমান: সৌদি অর্থ সহায়তা রূপ নিতে পারে জেএফ–সতেরো চুক্তিতে গৌর নদী: বরিশালের শিরা-উপশিরায় ভর করে থাকা এক জীবন্ত স্মৃতি আমার মতো আর কারও না হোক আকুর বিল পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৩২.৪৩ বিলিয়ন ডলার জ্যোতির নেতৃত্বে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দল ঘোষণা প্রবাসী আয়ে গতি আনতে নতুন নির্দেশনা, একই দিনে গ্রাহকের হিসাবে টাকা জমার আদেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালুকায় তরুণ হত্যাকাণ্ডে আরও এক অভিযুক্ত গ্রেপ্তার, ঢাকায় লুকিয়ে ছিল মূল উসকানিদাতা উত্তরে তারেকের সফর নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙছে না: সালাহউদ্দিন

ওজন কমানোর আশ্বাসে ওষুধ, বাস্তবে কাজই করে না অনেকের শরীরে

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে যেসব ইনজেকশন ও ওষুধকে সাম্প্রতিক সময়ে বিপ্লব বলা হচ্ছিল, সেগুলো যে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়—নতুন গবেষণা ও অভিজ্ঞতা সামনে আসতেই সেই ধারণায় বড় ফাটল ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারকারীদের অন্তত এক তৃতীয়াংশ কাঙ্ক্ষিত ফলই পাচ্ছেন না। সামাজিক মাধ্যমে যেসব সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়ছে, তার আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন এই মানুষগুলো।

শরীর যেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়

হান্না জোন্সের বয়স পঁয়ত্রিশ। সন্তান জন্মের পর ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। শরীরের ওজন সূচক প্রায় স্থূলতার সীমায় পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে নাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত ব্যায়াম ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ শুরু করলেও অগ্রগতি ছিল ধীর। তখনই সামাজিক মাধ্যমে দেখা নানা ভিডিও তাঁকে আশ্বস্ত করে—এই ইনজেকশন নিলেই নাকি অনায়াসে ওজন কমবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে তিনি ইনজেকশন শুরু করেন, মাসের পর মাস ডোজ বাড়ান, কিন্তু ক্ষুধা কমে না, ওজনও নয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফল শূন্য। তখন তাঁর মনে হয়েছে, যেন শরীরটাই তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করছে।

যাঁরা সাড়া দেন না

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এদের বলা হচ্ছে ‘নন রেসপন্ডার’। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের ওষুধ ব্যবহারকারীদের প্রায় দশ থেকে ত্রিশ শতাংশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ওজন হ্রাস হয় না। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এসব ওষুধ ব্যবহার করলে এই সংখ্যাটিও আরও বড় হবে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্যের গল্প এত বেশি যে, ব্যর্থতার এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রায় অদৃশ্যই থেকে যাচ্ছে।

কেন কাজ করে না

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কারও ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মে ডোজ না নেওয়া বা পর্যাপ্ত সময় ধরে ব্যবহার না করাও দায়ী। আবার কারও শরীরের জিনগত গঠনই এমন, যেখানে এই হরমোনভিত্তিক ওষুধ প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না। অন্ত্রের জীবাণুর গঠন, দীর্ঘদিনের ডায়েটিংয়ের ইতিহাস, এমনকি শরীরের বিপাকীয় অভিযোজনও বড় ভূমিকা রাখে। বহু বছর ধরে ক্যালরি কমিয়ে খাওয়ার ফলে শরীর এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে, নতুন কোনো সংকেতেও ক্ষুধা বা পরিতৃপ্তির অনুভূতি বদলায় না।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বাস্তবতা

অনেকেই আবার ফল দেখার আগেই ওষুধ বন্ধ করতে বাধ্য হন। বমিভাব, ডায়রিয়া, দুর্বলতা ও চরম ক্লান্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যালিস বেকারের অভিজ্ঞতাও তেমনই। শুরুতে তাঁর ক্ষুধা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, দৈনন্দিন কাজ করাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ওষুধ ছাড়তে বাধ্য হন। তখন তাঁর মনে হয়েছে, সব পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে।

সাফল্যের গল্পের চাপ

মনোবিদদের মতে, এই ওষুধ ঘিরে তৈরি ‘অলৌকিক সমাধান’-এর গল্প অনেকের আত্মসম্মানে আঘাত করছে। যখন চারপাশে সবাই বলছে জীবন বদলে গেছে, তখন নিজের শরীরে ফল না দেখলে মানুষ নিজেকেই দায়ী করতে শুরু করে। অথচ বাস্তবতা হলো, ওজন কমা বা না কমা শুধু ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; জীববিদ্যা ও মানসিকতার জটিল সমন্বয় এতে কাজ করে।

ওষুধের পরের জীবন

গবেষণায় আরও দেখা যাচ্ছে, যারা কিছুটা ওজন কমাতেও সক্ষম হন, ওষুধ বন্ধ করার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের বড় একটি অংশ আগের ওজনে ফিরে যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওষুধ সর্বোচ্চ একটি সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে। খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক, মানসিক চাপ, শরীর সম্পর্কে ধারণা—এসব বিষয় সমাধান না করলে স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।

শেষ কথা

ওজন কমানোর এই ওষুধগুলো অনেকের জন্য সহায়ক হলেও সবার জন্য সমাধান নয়। হান্না ও অ্যালিসের গল্প দেখায়, ব্যর্থতা মানে ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়। শরীর জটিল, সুস্থ হওয়াও জটিল। একক কোনো ওষুধে জীবন বদলে যাবে—এই বিশ্বাস থেকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট জন্ম নেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

কেরালার কারিগরদের হাতে ফিরল প্রাচীন নৌযানের গৌরব, সমুদ্রে পাড়ি দিল কৌণ্ডিন্য

ওজন কমানোর আশ্বাসে ওষুধ, বাস্তবে কাজই করে না অনেকের শরীরে

০৯:১৩:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে যেসব ইনজেকশন ও ওষুধকে সাম্প্রতিক সময়ে বিপ্লব বলা হচ্ছিল, সেগুলো যে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়—নতুন গবেষণা ও অভিজ্ঞতা সামনে আসতেই সেই ধারণায় বড় ফাটল ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারকারীদের অন্তত এক তৃতীয়াংশ কাঙ্ক্ষিত ফলই পাচ্ছেন না। সামাজিক মাধ্যমে যেসব সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়ছে, তার আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন এই মানুষগুলো।

শরীর যেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়

হান্না জোন্সের বয়স পঁয়ত্রিশ। সন্তান জন্মের পর ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। শরীরের ওজন সূচক প্রায় স্থূলতার সীমায় পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে নাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত ব্যায়াম ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ শুরু করলেও অগ্রগতি ছিল ধীর। তখনই সামাজিক মাধ্যমে দেখা নানা ভিডিও তাঁকে আশ্বস্ত করে—এই ইনজেকশন নিলেই নাকি অনায়াসে ওজন কমবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে তিনি ইনজেকশন শুরু করেন, মাসের পর মাস ডোজ বাড়ান, কিন্তু ক্ষুধা কমে না, ওজনও নয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফল শূন্য। তখন তাঁর মনে হয়েছে, যেন শরীরটাই তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করছে।

যাঁরা সাড়া দেন না

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এদের বলা হচ্ছে ‘নন রেসপন্ডার’। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের ওষুধ ব্যবহারকারীদের প্রায় দশ থেকে ত্রিশ শতাংশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ওজন হ্রাস হয় না। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এসব ওষুধ ব্যবহার করলে এই সংখ্যাটিও আরও বড় হবে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাফল্যের গল্প এত বেশি যে, ব্যর্থতার এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রায় অদৃশ্যই থেকে যাচ্ছে।

কেন কাজ করে না

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কারও ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মে ডোজ না নেওয়া বা পর্যাপ্ত সময় ধরে ব্যবহার না করাও দায়ী। আবার কারও শরীরের জিনগত গঠনই এমন, যেখানে এই হরমোনভিত্তিক ওষুধ প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না। অন্ত্রের জীবাণুর গঠন, দীর্ঘদিনের ডায়েটিংয়ের ইতিহাস, এমনকি শরীরের বিপাকীয় অভিযোজনও বড় ভূমিকা রাখে। বহু বছর ধরে ক্যালরি কমিয়ে খাওয়ার ফলে শরীর এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে যায় যে, নতুন কোনো সংকেতেও ক্ষুধা বা পরিতৃপ্তির অনুভূতি বদলায় না।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বাস্তবতা

অনেকেই আবার ফল দেখার আগেই ওষুধ বন্ধ করতে বাধ্য হন। বমিভাব, ডায়রিয়া, দুর্বলতা ও চরম ক্লান্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যালিস বেকারের অভিজ্ঞতাও তেমনই। শুরুতে তাঁর ক্ষুধা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, দৈনন্দিন কাজ করাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ওষুধ ছাড়তে বাধ্য হন। তখন তাঁর মনে হয়েছে, সব পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে।

সাফল্যের গল্পের চাপ

মনোবিদদের মতে, এই ওষুধ ঘিরে তৈরি ‘অলৌকিক সমাধান’-এর গল্প অনেকের আত্মসম্মানে আঘাত করছে। যখন চারপাশে সবাই বলছে জীবন বদলে গেছে, তখন নিজের শরীরে ফল না দেখলে মানুষ নিজেকেই দায়ী করতে শুরু করে। অথচ বাস্তবতা হলো, ওজন কমা বা না কমা শুধু ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; জীববিদ্যা ও মানসিকতার জটিল সমন্বয় এতে কাজ করে।

ওষুধের পরের জীবন

গবেষণায় আরও দেখা যাচ্ছে, যারা কিছুটা ওজন কমাতেও সক্ষম হন, ওষুধ বন্ধ করার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের বড় একটি অংশ আগের ওজনে ফিরে যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওষুধ সর্বোচ্চ একটি সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে। খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক, মানসিক চাপ, শরীর সম্পর্কে ধারণা—এসব বিষয় সমাধান না করলে স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।

শেষ কথা

ওজন কমানোর এই ওষুধগুলো অনেকের জন্য সহায়ক হলেও সবার জন্য সমাধান নয়। হান্না ও অ্যালিসের গল্প দেখায়, ব্যর্থতা মানে ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়। শরীর জটিল, সুস্থ হওয়াও জটিল। একক কোনো ওষুধে জীবন বদলে যাবে—এই বিশ্বাস থেকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট জন্ম নেয়।