কেরালার এক সাধারণ কাঠমিস্ত্রির বহুদিনের স্বপ্ন অবশেষে রূপ পেল বাস্তবে। ভারতের নৌবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী সেলাই করা পালতোলা জাহাজ কৌণ্ডিন্য সমুদ্রে যাত্রা শুরু করতেই প্রাণ ফিরে পেল উপকূলজুড়ে হারিয়ে যেতে বসা প্রাচীন নৌনির্মাণ ঐতিহ্য। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে পোরবন্দর থেকে ওমানের উদ্দেশে প্রথম সমুদ্রযাত্রায় বের হয় এই বিশেষ নৌযান।
কারিগরের স্বপ্ন থেকে জাতীয় গর্ব
কোঝিকোড় জেলার ভাটাকারা এলাকার বাসিন্দা একষট্টি বছর বয়সী বাবু শংকরনই এই নৌযানের প্রধান নির্মাতা। মালাবারের প্রায় বিশজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দীর্ঘ ষোলো মাস ধরে তৈরি করেন কৌণ্ডিন্য। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে যখন তাঁকে এই কাজের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখনই তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন নতুন প্রাণ পায়। দুহাজার তেইশ সালের শেষদিকে কাজ শুরু হয়ে সম্পূর্ণ হয় ঐতিহ্যবাহী সেলাই করা তক্তা প্রযুক্তিতে।
নারকেলের ছোবড়ায় বাঁধা কাঠের ইতিহাস
প্রায় কুড়ি মিটার দীর্ঘ এই জাহাজে কাঠের তক্তাগুলি একে অপরের সঙ্গে জোড়া হয়েছে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি দড়ি দিয়ে। কোনো আধুনিক ধাতব পেরেক নয়, বরং প্রাকৃতিক রেজিন ব্যবহার করে সিল করা হয়েছে প্রতিটি সংযোগস্থল। এক সময় ভারতের উপকূল এবং ভারত মহাসাগর জুড়ে প্রচলিত এই পদ্ধতিই ছিল নৌনির্মাণের মূল ভরসা। বাবু শংকরনের মতে, এই কাজ শুধু একটি জাহাজ তৈরি নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া দক্ষতার পুনর্জাগরণ।

গোয়ায় দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ
পুরো নির্মাণ কাজের সময় গোয়ার একটি জাহাজঘাটেই অবস্থান করেন কারিগররা। নৌবাহিনীর আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে দিনরাত পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হয় কাজ। এর আগে দেশে ও বিদেশে এমন কয়েকটি প্রকল্পে যুক্ত থাকলেও কৌণ্ডিন্য তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন এই কারিগর।
ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রের উদ্যোগ
নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, নৌবাহিনী এবং একটি বেসরকারি উদ্ভাবনী সংস্থার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল দেশের নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষতাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং প্রাচীন সমুদ্রসভ্যতায় ভারতের ভূমিকা তুলে ধরা। দুহাজার পঁচিশ সালের মে মাসে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে কিংবদন্তি নাবিক কৌণ্ডিন্যের নামে, যিনি প্রাচীনকালে ভারত থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্রপথে যাত্রা করেছিলেন বলে বিশ্বাস।

নৌযানে ফুটে উঠেছে সংস্কৃতির ছাপ
কৌণ্ডিন্যের প্রতিটি অংশে রয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতীক। পালজুড়ে আঁকা রয়েছে দ্বিমুখী পৌরাণিক পাখি গান্ডভেরুন্ডা ও সূর্যের প্রতীক। নৌযানের সামনের অংশে খোদাই করা হয়েছে সিংহমুখী পৌরাণিক প্রাণী সিম্হ যালি। ডেকে রাখা হয়েছে হরপ্পা যুগের প্রতীকী পাথরের নোঙর। কারিগরদের ভাষায়, এই নকশাগুলি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক নীরব ভাষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















