২০২৫ সালে সমুদ্রে অভূতপূর্ব শক্তি সঞ্চিত
‘অ্যাডভান্সেস ইন অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ২০২৫ সালে বিশ্ব সমুদ্রসমূহ অতিরিক্ত ২৩ জেটাজুল তাপ শোষণ করেছে—যার তুলনা করা যায় দৈনিক ১২টি হিরোশিমা আণবিক বোমা বিস্ফোরণের শক্তির সঙ্গে। গবেষণাটি ৫০‑এর বেশি বিজ্ঞানীর যৌথ প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯ জানুয়ারি ওয়্যার্ডে প্রতিবেদন করা হয়েছে। এটি টানা অষ্টম বছর যখন সমুদ্রের তাপ ধারণ নতুন রেকর্ড গড়ল। গ্রিনহাউস গ্যাসে আটকে থাকা অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্র ধারণ করে, তাই পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণে সমুদ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বাফার।
এখানে গবেষকরা জাহাজ ও স্যাটেলাইটের পরিমাপ, তাপমাত্রা মডেল ও আরগো ফ্লোট নেটওয়ার্কের তথ্য ব্যবহার করেছেন। আরগো নেটওয়ার্কে ৩,৫০০‑এরও বেশি রোবোটিক বয় আছে, যা দুই হাজার মিটার গভীরে ডুবে তাপমাত্রা রেকর্ড করে। ২০২৪ সালে শক্তিশালী এল নিনো পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ালেও ২০২৫‑এর লা নিনিয়া পরিবেশে পৃষ্ঠের পানি কিছুটা ঠান্ডা ছিল। তবু নিচের স্তরে তাপ বিপুল হারে বেড়েছে। বার্কলে আর্থের জলবায়ু বিজ্ঞানী জেক হাউজফাদার বলেন, “গভীর সমুদ্রের উষ্ণতা দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু প্রবণতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক কারণ এটি মোট শক্তি ভারসাম্য নির্দেশ করে।”
গভীর তাপের পরিণতি সর্বত্র ছড়াচ্ছে
সমুদ্রের তাপমাত্রা কেন জরুরি? উষ্ণ পানি হারিকেন ও ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়ায়, সামুদ্রিক তাপ তরঙ্গ তৈরি করে এবং পানিকে প্রসারিত করে, যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে। গবেষণার আরেক সহযোগী, তাপবিদ্যা বিশেষজ্ঞ জন আব্রাহাম বলেন, এই রেকর্ড তাপ মানে ঝড়গুলো আরও শক্তি পাবে এবং ধ্বংসক্ষমতা বাড়াবে। দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণায়ন প্রবাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও বিপদ ডেকে আনে; প্রবালগুলি ইতিমধ্যে ব্লিচিংয়ের কারণে হুমকির মুখে।
গবেষকরা সতর্ক করছেন যে, এই দ্রুত তাপ সঞ্চয়ের প্রবণতা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কার্বন পা–ছাপ কমানো সম্ভব হলেও, তারা বলছেন যে জ্বালানি উৎপাদন, পরিবহন ও জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া তাপ বাড়া থামানো যাবে না। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়া, বন সংরক্ষণ ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করার নীতি সমর্থন দিতে হবে। পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মৎস্য, আবহাওয়া স্থিতিশীলতা ও উপকূলীয় নগর জীবনের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য গবেষণাটি সতর্কবার্তা। ২০২৫ সালের তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ ছিল; সমুদ্রে সঞ্চিত এই রেকর্ড তাপ আগামী বছরগুলোতে আরও চরম পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। সমুদ্র একটি বিরাট তাপ ব্যাটারির মতো, যা ক্ষণিকের জন্য বায়ুমণ্ডলকে ঠান্ডা রাখে কিন্তু সঞ্চিত শক্তি পরে ফিরে আসে। বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তাপ পর্যবেক্ষণে আরও বিনিয়োগ ও উন্নত মডেল তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে হারিকেন, বৃষ্টিপাত ও খরার পূর্বাভাস আরও নির্ভুল হয়। এর ফলে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী সময়মতো প্রস্তুতি নিতে পারবে।
অনেক মানুষ এখনও সমুদ্রের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন নন, যদিও সামুদ্রিক উষ্ণায়ন মাছের প্রাপ্যতা থেকে শুরু করে উপকূলীয় সম্পত্তির মূল্য পর্যন্ত সবকিছুকে প্রভাবিত করে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন, পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ওঠানামা করলে মানুষ হয়তো ভ্রান্ত ধারণা পেতে পারে যে তাপমাত্রা কমে গেছে। তাই এই গবেষণা গভীর তাপের ব্যাপারটি সামনে আনতে চায় এবং গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর দাবিকে জোরদার করতে চায়। হাউজফাদার বলেন, “সমুদ্রের তাপ পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য থার্মোমিটার,” এবং এটি আমাদের জানাচ্ছে যে বড় পরিবর্তনের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















