ইউরোপীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক স্বাধীনতা
[প্যারিসে ফরাসি রাষ্ট্রদূতদের এক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ‑নোয়েল বারো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউরোপের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রস্তাব দেয়, তখন ইউরোপের তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি ঐতিহ্যগত মিত্রতার কাঠামো ভেঙে ফেলেছে এবং বারো এ প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে ওয়াশিংটন কয়েক মাসেই ইউরোপ‑আমেরিকা সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন এনেছে। তিনি পরিষ্কার করেন, এই সম্পর্ক যত পুরাতনই হোক না কেন, তা ইউরোপকে সব কিছুতে ‘হ্যাঁ’ বলতে বাধ্য করে না। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাব থেকে শুরু করে নতুন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা—এগুলো ইউরোপের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বারো মনে করেন, কয়েক দশক ধরে রুশ আগ্রাসনের মতো আজ যুক্তরাষ্ট্রও ইউরোপীয় ঐক্যকে পরীক্ষা করছে।
রাশিয়া ও মার্কিন চাপের তুলনা টেনে তিনি বলেন, বাইরের ‘বিরোধীরা’ ইউরোপের ভেতরকার বিভেদকে কাজে লাগাতে চায়। সামরিক হুমকি, বাণিজ্যিক ব্ল্যাকমেইল ও গ্রিনল্যান্ডের দাবি দিয়ে তারা ঐক্য নড়বড়ে করতে চায়। বারো আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আইনে ইউরোপীয় তথ্য‑নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা তাদের নিজস্ব নিয়ম প্রতিষ্ঠার ক্ষমতার ওপর আঘাত। তার ভাষণের কয়েক দিন আগে জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক‑ভাল্টার স্টাইনমায়ের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানসিকতা বদলে গেছে এবং বিশ্ব এখন “ডাকাতের আস্তানায়” পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে। বারোর বক্তব্য সেই উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো এখন স্পষ্টতই জানিয়ে দিচ্ছে যে, তাদের স্বার্থের বিরোধে তারা ওয়াশিংটনের কাছে মাথা নত করবে না।
ভোট ও অভ্যন্তরীণ চাপ
বারোর বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে যখন ফ্রান্সে ২০২৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু বাহ্যিক শক্তি ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য থেকে সরে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে। ফরাসি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ বক্তব্য আংশিকভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উদ্দেশ্যে; ট্রাম্পের far‑right দলগুলোকে উৎসাহ দেওয়া ফরাসিদের কাছে হস্তক্ষেপ হিসেবে ধরা পড়েছে। একই সঙ্গে এটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগকে প্রকাশ করে যে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কূটনৈতিক কাঠামোকে ভাঙতে পারে। ইউরোপীয় নীতি নির্ধারকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের চাপে তারা নিজস্ব অগ্রাধিকার বিসর্জন দিতে বাধ্য হতে পারেন।
ট্রাম্পের নীতিগুলো ইতিমধ্যে ইউরোপকে নাড়া দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব প্রথমে হাস্যকর মনে হলেও নীতিনির্ধারকেরা জানতেন, দ্বীপটি বিরল খনিজের ভান্ডার ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে আকর্ষণীয়। এর জবাবে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান নিষিদ্ধ করেছে এবং পরিবেশগত সমীক্ষা বাড়িয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ওপর যে অনলাইন সেন্সরশিপ‑বিরোধী আইন প্রয়োগ করেছে, তা ব্রাসেলসে বাকস্বাধীনতার ওপর হামলা হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে আমেরিকান শুল্ক ও জার্মানিতে সৈন্য প্রত্যাহারের হুমকি মিত্রতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করেছে। তাই বারোর বক্তব্যে যে “না” বলার অধিকার তুলে ধরা হয়েছে, তা প্যারিস, বার্লিন ও অন্যান্য রাজধানী থেকে আরও স্পষ্ট আওয়াজ শোনা যেতে পারে।
একতাবদ্ধ ইউরোপের লক্ষ্য
এই বক্তব্য ইউরোপে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে—কিভাবে মহাদেশ নিজেদের পুনর্গঠিত করবে। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি‑জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বাধীন নীতি জরুরি। অন্যরা সতর্ক করে বলেছেন, রুশ আগ্রাসন মোকাবেলা, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও মুক্ত বাণিজ্য রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করা দরকার। তাই বারোর বক্তব্যকে অংশীদারিত্বে ভারসাম্য আনার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেন, পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রে সহযোগিতা থাকবে, তবে ইউরোপীয় নিয়ম ও মূল্যবোধের প্রতি সম্মান চাই।
সাধারণ ইউরোপীয়দের কাছে এ আলোচনা দূরত্বের মনে হতে পারে, কিন্তু এটি তথ্য সুরক্ষা, শিল্প নীতি ও সীমান্ত নিরাপত্তাসহ দৈনন্দিন নানা বিষয়ে প্রভাব ফেলবে। ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রকে চটিয়ে না দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করতে পারে, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি পর্যন্ত বৈশ্বিক নিয়ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে। কিন্তু সম্পর্কের অবনতি ঘটলে অনিশ্চয়তা বাড়বে। অস্থির ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বারোর বার্তা স্পষ্ট: ইউরোপ অংশীদার হতে চায়, অধীনস্থ নয়, এবং নিজেদের স্বার্থবিরোধী প্রস্তাব খারিজ করতে প্রস্তুত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















