ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র ঘিরে নতুন করে বৈশ্বিক উত্তাপ বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলন ব্যাপকভাবে বাড়ানোর যে পরিকল্পনা সামনে এনেছেন, তা নিয়ে পরিবেশবিদ ও অর্থনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যেমন আর্থিকভাবে কঠিন, তেমনি জলবায়ুর জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।
ভেনেজুয়েলার তেলের দখল ঘিরে ট্রাম্পের বার্তা
ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ট্রাম্প দেশে তেল ও গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি নজর দিয়েছেন বিদেশের বিশাল তেল ভান্ডারের দিকে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার পর তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন, দেশটির বিপুল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা উচিত। তাঁর বক্তব্যে বলা হয়, তেল কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করবে, ভাঙাচোরা অবকাঠামো মেরামত করবে এবং উত্তোলিত তেল থেকে বিপুল অর্থ তুলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের খরচ পুষিয়ে নেবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ভাণ্ডার ও বাড়তি কার্বন ঝুঁকি
ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভাণ্ডার রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় তিনশো বিলিয়ন ব্যারেল। বর্তমানে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় দশ লক্ষ ব্যারেল। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদন যদি দৈনিক পনেরো লক্ষ ব্যারেলে উন্নীত হয়, তবে বছরে প্রায় পঞ্চান্ন কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়াবে। এই পরিমাণ দূষণ যুক্তরাজ্য বা ব্রাজিলের মতো বড় অর্থনীতির বার্ষিক নিঃসরণের চেয়েও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জলবায়ু ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন করে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল বাজারে এলে বৈশ্বিক উষ্ণতা দ্রুত বাড়বে। তাঁদের মতে, পৃথিবীর মানুষ এই অতিরিক্ত দূষণের বোঝা বহন করতে পারবে না। ভেনিজুয়েলার তেল বিশেষভাবে দূষণকারী, কারণ সেখানে অতিভারী অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়, যা উৎপাদন ও পরিশোধনের সময় বেশি কার্বন ও মিথেন ছাড়ে।
নবায়নযোগ্য শক্তির পথে বাধা
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলায় তেল উত্তোলন বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমবে। এতে নবায়নযোগ্য শক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে যাওয়ার যে গতি তৈরি হয়েছে, তা শ্লথ হয়ে পড়বে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভেনেজুয়েলার জনগণসহ পুরো বিশ্ব। স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক লাভ হলেও জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষতি সেই লাভকে ছাপিয়ে যাবে।
অর্থনীতি ও রাজনীতির জটিল বাস্তবতা
তেল উৎপাদন বাড়াতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক অতিরিক্ত পাঁচ লক্ষ ব্যারেল তেল তুলতে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার এবং অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। আবার সত্তরের দশকের সর্বোচ্চ উৎপাদনে ফিরতে হলে ওরিনোকো অঞ্চলের ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ তেল উন্নয়ন করতে হবে, যা আরও ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা সংকট এবং অতীতের অব্যবস্থাপনা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ফসিল জ্বালানিকেন্দ্রিক আধিপত্যের অভিযোগ
সমালোচকেরা ট্রাম্পের নীতিকে ফসিল জ্বালানিনির্ভর আধিপত্যবাদ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, লাতিন আমেরিকাকে সম্পদের উপনিবেশ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরে আসতে হবে। ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সে দেশের জনগণ, বিদেশি তেল নির্বাহীরা নয়।
পরিবেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি
সব দিক বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের মত, ভেনিজুয়েলায় তেল উত্তোলন বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগ পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে। বিশ্ব যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা অতিক্রমের মুখে, তখন এমন সিদ্ধান্ত মানবজাতির জন্য আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















